সুসংবাদ বাংলাদেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি দের জন্যে

Moderators: Mramushi, kayum

Forum rules
English language is forbidden on this local forum!

You only need to talk about cryptocurrency or you will be banned from the forum and lose your wallet !!

আপনি শুধুমাত্র cryptocurrency সম্পর্কে কথা বলতে হবে বা আপনার ফোরাম থেকে নিষিদ্ধ করা হবে এবং আপনার ওয়ালেট হারান !!

Forum to ask questions ... Forbidden copied / pasted texts !!
Post Reply
Ledger Nano S - The secure hardware wallet
User avatar

Topic author
TanvirNiloy
JuniorUnicorn
JuniorUnicorn
Posts: 273
Joined: 17 Feb 2018, 07:47
Cash on hand: 356.16
Bank: 0.00
Has thanked: 0
Been thanked: 3 times
Bangladesh

#23201

21 Feb 2018, 19:46

হায় আমি তানভিন নিলয়
আশা করি সবাই ভাল আছেন..
:) :)
mramushi নামে এক বাংলাদেশি ভাই কে বাংলা ফোরাম এর জন্যে মোডারেটর হসেবে প্রমোট করা হইছে, ওনাকে মোডারেটর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়ে জাতে করে আপনার কেও স্পেম না করেন সো সবাই সাবধানে কাজ করবেন, আর ভয় পাবার কিছু নেই ওনি অত্তান্ত ভালো মানুষ আমার বড় ভাই স্পেম না করে ভালো করে কাজ করে জান আশা করি ভালো কিছু করা যাবে এইসাইট থেকে.

[ Post made via Android ]


User avatar

kamruzzaman
BabyUnicorn
BabyUnicorn
Posts: 129
Joined: 16 Feb 2018, 17:43
Cash on hand: 0.64
Has thanked: 0
Been thanked: 1 time
Bangladesh

#23213

21 Feb 2018, 20:01

যেহেতু নিজের দেশের ভাই,সো আমাদের উপর কঠোর হবেন না।

User avatar

ebrahim
BabyUnicorn
BabyUnicorn
Posts: 60
Joined: 19 Feb 2018, 06:30
Cash on hand: 0.52
Has thanked: 4 times
Been thanked: 4 times
Bangladesh

#23543

22 Feb 2018, 13:13

ভালো পোস্ট।পরে অনেক ভালো লাগলো।আসা করি এমন ভালো ভালো পোস্ট আরো করবেন।

[ Post made via Android ]
User avatar

imran007
Merit1
Merit1
Posts: 525
Joined: 18 Feb 2018, 12:52
Cash on hand: 0.16
Has thanked: 53 times
Been thanked: 66 times
Pakistan

#23544

22 Feb 2018, 13:14

ভাই আপনার পোস্টটি অনেক কাজের একটা পোস্ট।আসা করি সবার অনেক কাজে আসবে।এমন পোস্ট আরো চাই।

[ Post made via Android ]
User avatar

sahid361222
BabyUnicorn
BabyUnicorn
Posts: 102
Joined: 18 Feb 2018, 08:41
Cash on hand: 1,714.76
Has thanked: 6 times
Been thanked: 8 times
Bangladesh

#23545

22 Feb 2018, 13:14

পোস্টটা পরে ভালো লাগলো।আসা করি এমন পোস্ট আরো বেশি বেশি পাবো। আমরাও আপনাদের সাথে আছি আশা করি এভাবে সাথে থাকবেন।
User avatar

mahfuj2228
Fresh Unicorn
Fresh Unicorn
Posts: 22
Joined: 17 Feb 2018, 06:42
Cash on hand: 157.32
Has thanked: 0
Been thanked: 0
Bangladesh

#23551

22 Feb 2018, 13:25

সংবাদ টা অনেক সুন্দর । তবে সাবধানের মার নেই। তাই একটু দেখে শুনে কাজ করাটাই ভাল?

[ Post made via Android ]
User avatar

cryptoanik
BabyUnicorn
BabyUnicorn
Posts: 107
Joined: 19 Feb 2018, 11:24
Cash on hand: 0.00
Has thanked: 0
Been thanked: 0
Bangladesh

#23589

22 Feb 2018, 15:10

ওভিনন্দন আসাকরি আমাদের সাহায্য করবেন
User avatar

hridoy57
BabyUnicorn
BabyUnicorn
Posts: 145
Joined: 19 Feb 2018, 08:46
Cash on hand: 1,177.64
Bank: 0.00
Has thanked: 1 time
Been thanked: 3 times
Bangladesh

#23604

22 Feb 2018, 16:10

হুম গুড নিউজ আমাদের সবার জন্য।। আশাকরি তার মাধ্যমে বাংলাদেশী ভাইয়েরা সঠিক পথে পরিচালিত হবে।।
User avatar

sarwar25
BabyUnicorn
BabyUnicorn
Posts: 126
Joined: 17 Feb 2018, 19:15
Cash on hand: 120.88
Has thanked: 0
Been thanked: 0
Bangladesh

#23655

22 Feb 2018, 18:22

অভিনন্দন এমআরমুশি ভাই। আপনাকে বাংলা কমিউনিটির মোডারেটর হিসেবে দেখতে পেরে খুব ভালো লাগল। আসলেই এরকম একটি ফোরামের নতা হয়ে নেতৃত্ব দেয়া অনেক গর্বের এবং সম্মানের। ধন্যবাদ

JahidHasan
Fresh Unicorn
Fresh Unicorn
Posts: 27
Joined: 20 Feb 2018, 12:46
Cash on hand: 246.60
Has thanked: 0
Been thanked: 0
Bangladesh

#23665

22 Feb 2018, 18:31

অভিনন্দন ভাইকে।আমাদের সহায়ক হবেন উনি আশা করি।
আর আপনাকেও ধন্যবাদ তানভির ভাই।এই সুঃসংবাদ টা দেয়ার জন্য।

[ Post made via Android ]
User avatar

Rojibdx
BabyUnicorn
BabyUnicorn
Posts: 72
Joined: 18 Feb 2018, 17:14
Cash on hand: 468.88
Has thanked: 0
Been thanked: 0
Bangladesh

#23848

23 Feb 2018, 13:09

হুম্ম ভাই বড় ভাই কে আমাদের সবার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ। আর বড় ভাই কে আনাদের দিকে একটু নজর রাখতে।
User avatar

CryptoHabib
BabyUnicorn
BabyUnicorn
Posts: 143
Joined: 16 Feb 2018, 06:39
Cash on hand: 416.90
Has thanked: 0
Been thanked: 0
Bangladesh

#23852

23 Feb 2018, 13:24

কংগো মডারেটর ভাইকে, ধন্যবাদ আমাদের খবর টি জানানোর জন্য।

[ Post made via Samsung Galaxy S Duos 2 ]
User avatar

Mramushi
JuniorUnicorn
JuniorUnicorn
Posts: 327
Joined: 17 Feb 2018, 10:01
Cash on hand: 4.40
Bank: 0.00
Has thanked: 6 times
Been thanked: 9 times
Bangladesh

#23960

23 Feb 2018, 18:53

আশা করি আমরা সকলে ফোরামের নিয়ম মেনে কাজ করব তাহলে আর কোন সমস্যা হবে না

[ Post made via LG ]
User avatar

rmrafi
Fresh Unicorn
Fresh Unicorn
Posts: 30
Joined: 16 Feb 2018, 19:11
Cash on hand: 104.04
Has thanked: 0
Been thanked: 1 time
Bangladesh

#23963

23 Feb 2018, 19:08

হুম নিউজটাতো ভালো।এখন দেখাযাক কি হয়

[ Post made via Android ]

Almamun5055
Fresh Unicorn
Fresh Unicorn
Posts: 35
Joined: 20 Mar 2018, 16:16
Cash on hand: 4.40
Has thanked: 0
Been thanked: 1 time
Bangladesh

#30765

22 Mar 2018, 03:47

আমাদের দেশের বলতে আমাদের কাচের মডরেটর ভাইদের কে অনেক অনেক ধন্যবাদ সব বিসয়ে হেল্প করার জন্যে

[ Post made via Android ]
User avatar

iemon
JuniorUnicorn
JuniorUnicorn
Posts: 255
Joined: 16 Feb 2018, 07:21
Cash on hand: 2,632.26
Has thanked: 3 times
Been thanked: 3 times
Bangladesh

#32265

25 Mar 2018, 14:12

ধন্যবাদ। শেয়ার করার জন্য।

[ Post made via Android ]

Rion54
Fresh Unicorn
Fresh Unicorn
Posts: 25
Joined: 20 Feb 2018, 08:43
Cash on hand: 43.17
Has thanked: 9 times
Been thanked: 0
Bangladesh

#32410

25 Mar 2018, 22:34

ভালো সংবাদ।আপনাদের কে অভিনন্দন।

গদফগফসি
ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে আলোচনার আগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সচরাচর ব্যবহৃত মুদ্রাব্যবস্থা নিয়ে একটু জেনে নেয়া যাকঃ

বহু বছর আগে থেকেই মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী জিনিসপত্র লেনদেন করে আসছে। লেনদেনের সবচেয়ে প্রাচীন এবং অধিক প্রচলিত প্রথার মধ্যে অন্যতম ছিলো বিনিময় প্রথা। কিন্তু মানদন্ডের বিচারে সেখানে বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছেন। ধরা যাক, ফল ব্যবসায়ী শফিক সাহেবের একবস্তা চাল লাগবে এবং বিনিময়ে তাকে এক বস্তা তুলা দিতে হবে। কিন্তু শফিক সাহেবের কাছে কোন তুলা নেই। যেহেতু শফিক সাহেবের কাছে কোন তুলা নেই, তাহলে এখানে বিনিময় কার্য সম্পন্ন হতে পারছেনা।

বিনিময় প্রথার এই সমস্যা থেকে নিস্তার পাওয়ার লক্ষ্যে সবাই এমন একটা প্রথা উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো, যেখানে সব ধরণের পণ্যের একটা আদর্শ মূল্য থাকবে। উদাহরণ হিসেবে গোল্ডের কথা বলা যেতে পারে। অনেক বছর আগে থেকে এখনো গোল্ডকে সম্পদ পরিমাপের একটা একক হিসাবে ধরা হত। আগে সরাসরি গোল্ড লেনদেন হত, সেটা একসময় মানুষের প্রয়োজনমত কাগজের মুদ্রা ব্যাবস্থায় রূপ নেয়।

এভাবে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রা যেমন, টাকা, ডলার, পাউণ্ড, ইউরো ইত্যাদি এসেছে। দেশের অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই মুদ্রা ছেপে বাজারে ছাড়তে পারে মানুষের ব্যবহারের জন্য। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন বা সম্পদ আদান প্রদান সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো দেশের আইন অনুযায়ী সামলানোর জন্য তৈরি হয়েছে ব্যাংক বা ব্যাংকিং সিস্টেম। কিন্তু এতে করেও সমস্যার সমাধান হয়নি। পৃথিবীর ইতিহাসে বড় বড় ব্যাংক ডাকাতির ভয়াবহ গল্পগুলো শুনলে কার না হৃদয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়! তবুও সময় বয়ে যায়, আর মানুষ ও দমে যাবার পাত্র নয়। নিজের প্রয়োজনে তারা আবিষ্কার করে একের পর এক বিস্ময়। আজকে আমরা তেমনি এক বিস্ময়ের কথা বলবো।

বর্তমানে প্রচলিত নানান মূদ্রা
বর্তমানে প্রচলিত নানান মূদ্রা
মূল আলোচনায় যাবার আগে আমরা একটা কাল্পনিক দৃশ্যপট কল্পনা করার চেষ্টা করবো।

খুব ছোটবেলা থেকে আপনার অনেক ধরণের শখ আছে। এর মধ্যে অন্যতম শখ হচ্ছে আর্ট এন্ড কালচার। অর্থাৎ এই আধুনিকায়ন সভ্যতায় বসে আপনার দুষ্প্রাপ্য চিত্রকর্মের প্রতি বিশেষ আগ্রহ আছে। খুব ছোটবেলা থেকে সংগ্রহ করছেন। তাই নিজের এত বছরে সংগ্রহ করা চিত্রকর্ম নিয়ে আপনার ছোটখাটো একটা মিউজিয়াম আছে। কথায় আছে শখের তোলা ৮০, এর জন্য মূল্য ও দিতে হয় অনেক। এসব জিনিস সংগ্রহ করা এবং নিজের সংগ্রহে রাখা দুইটারই ঝামেলা অনেক। কারন এসবের উপর নানা ধরনের লোকজনের নজর থাকে, অনেক সময় এগুলো নিয়ে বড় ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধ কিংবা দুর্ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় শেষের দিকে অথবা চাকরি নিয়ে বেশ ব্যস্ত কিংবা এখন আর আগের মতো পেইন নিতে চান না, আবার শখের জিনিষ ছাড়তে ও চান না। তাই বেশ কিছুদিন ধরে ভাবছেন এমন কোন উপায় নিয়ে যা দিয়ে সংগ্রহের সকল আর্টগুলো এমনভাবে সংরক্ষণ করা যায় যেন,

প্রথমেই পণ্যের গুণগত মান নিশ্চায়ন করা।
আর্থিক লেনদেন এবং আইনগত ব্যাপারগুলো বাড়িতে বসে, বিনা ঝামেলায়, নীরবে এবং স্বল্পতম সময়ে করে ফেলা।
বিক্রয় করার সময় একটি স্বচ্ছ লেনদেন প্রক্রিয়া।
পণ্যের কঠোর নিরাপত্তা।
অর্থাৎ যদি কোন চোর কোনক্রমে আপনার কোন আর্ট চুরি করে বাইরে বিক্রি করতে যায়, তাহলে যেন সে চোরাই জিনিস বিক্রির দায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং চোর যদি পালিয়েও যায়, যে সেটা কিনেছে সে ধরা পড়ে চোরাই জিনিস কেনার অপরাধে।

বিনিময় প্রথা তো আর আপনার এই চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থা চাইলেই আপনার এই সমস্যা দূর করতে পারে। কিন্তু ঐ যে বললাম বড় বড় ব্যাংক ডাকাতির করুণ ইতিহাসের কথা। অন্যদিকে আপনি যে ধরণের আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যাংকগুলো এই মুহূর্তে দিতে পারছে না।

আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি সেই সাপেক্ষে ব্যাংকের ভূমিকা একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করি।

আপাতত আমরা এখানে ব্যাংকের গুরুত্ব বুঝানোর চেষ্টা করি। ধরে নিচ্ছি, আপনি আপনার চিত্রকলা সম্পর্কিত কোন কাজের জন্য মিসরের কোন এক পত্নতাত্ত্বিক ব্যবসায়ীর কাছে টাকা পাঠাবেন। তো আপনি জানেন কিংবা শুনেছেন যে প্রায় সময় তারা টাকা নিয়ে অনেক ধরণের অনৈতিক পথের আশ্রয় নেয়। তাই আপনি তাদের টাকা দিতে ঠিক ভরসা পাচ্ছেন না। যদি টাকা নিয়ে সে ব্যবসায়ী অস্বীকার করে! সুতরাং এক্ষেত্রে আপনার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান লাগবে যেখানে আপনি স্বাচ্ছন্দে টাকা আদান-প্রদান করতে পারবেন। অর্থাৎ আপনার অ্যাকাউন্টের টাকা আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিসরের সেই ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে যাবে, এবং প্রতিষ্ঠানটি সেই লেনদেনের রেকর্ড রাখবে যাতে এই লেনদেন নিয়ে দুইজনের কেউ কোন প্রশ্ন না তুলতে পারে। এই মাঝখানের প্রতিষ্ঠানটি হল ব্যাংক।

কেমন হতো যদি আপনি তৃতীয় কোন পক্ষ কিংবা ব্যাংকের আশ্রয় না নিয়ে কোন উপায়ে মিসরের সেই ব্যবসায়ীকে টাকা দিতে পারতেন? এখানে আমরা মূলত একটি প্রসেস নিয়ে চিন্তা করছি যা একটি ব্যাংকের চাইতে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে কোন অর্থ লেনদেন নিশ্চিত করবে। এমনকি সেই সিস্টেমে থাকবে না হ্যাংকি কিংবা কোন ধরণের লুটপাটের সম্ভাবনা।

আসলে এই প্রযুক্তির নাম হল ব্লকচেইন, যাকে বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তিবিদ ভবিষ্যতের ব্যাংকিং টেকনোলজি হিসাবে দেখছেন এবং কিছু প্রভাবশালী দেশের কয়েকটি ব্যাংক ইতোমধ্যে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এই প্রযুক্তির পেছনে। ব্লকচেইন সিস্টেম এবং সেটার জন্য প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন ডিজাইন ও ডেভেলপ করেন যিনি তার নাম সাতোশি নাকামোতো। 'যিনি' কথাটা এখানে সম্ভবত ঠিক নয়, কেননা সাতোশি নাকামতোর পরিচয় এখনও জানা যায়নি। এটা হতে পারো কোন ব্যাক্তি, গোষ্ঠি, প্রতিষ্ঠার বা কোম্পানির কোডনেম।

এতক্ষণ পর্যন্ত ঠিকই ছিলো। এখন নিশ্চইয় ভাবছেন এই ব্লকচেইন আবার কি! তাহলে চলুন ব্লক চেইন নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

ব্লকচেইন কি?
মোটামুটি নির্দিষ্ট একটি সময়ের মধ্যে সারা পৃথিবী জুড়ে যত অর্থের বা সম্পদের লেনদেন হচ্ছে সেই লেনদেনের সকল এনক্রিপটেড তথ্য একসাথে নিয়ে একটা ব্লক বানানো হয়। সেই ব্লক দিয়ে ক্রমানুসারে সাজানো সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয় একটা ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড লেজারকেই মূলত ব্লকচেইন বলা হয়। কেমন যেন ঘোলাটে লাগছে সব কিছু, তাইনা! বিটকয়েন কে আমরা এখন অনেকেই চিনি। এখানে আমরা যে ব্লক চেইনের কথা বলছি তার একটা উদাহরণ হচ্ছে বিটকয়েন ব্লকচেইন। বিটকয়েন একটা ক্রিপ্টোকারেন্সি যা কোন একটা ব্লকচেইন ব্যবহার করে পরিচালিত হয়।

ব্যাংকের যাবতীয় লেনদেন রেকর্ড করার জন্য সকল শাখায় একটা বড় সাইজের খাতা থাকে। আর যে ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে, তাদের এই রেকর্ড থাকে ডেটাবেইজে। হয়তো, সেই পুরানো খাতাতেও থাকে। এই বড় সাইজের খাতাটাকে বলে লেজার। তো একটা ভ্যালিড ট্রানকেজশানের জন্য অবশ্যই ব্যাংকের লেজারে সেটার এন্ট্রি থাকতে হবে। ব্লকচেইন এরকম একটা লেজার, যেখানে পাশাপাশি একটার পর একটা এরকম অনেকগুলো ব্লক থাকে। প্রত্যেকটা ব্লকের ভিতর থাকে একটা সময়ে মাঝে সারা পৃথিবীতে যত ট্রানজেকশান হয়েছে সেটার সকল ডেটা। এই ডেটা ওপেন কিন্তু এনক্রিপ্টেড অর্থাৎ সবাই দেখতে পারবে এই ডেটা কিন্তু পড়তে গেলে প্রাইভেট কী লাগবে। অর্থাৎ আপনি যদি এখানে ট্রাঞ্জেকশান করে থাকেন তাহলে শুধুমাত্র আপনি এখান থেকে আপনার ট্রানজেকশনের সকল তথ্য সেটার প্রাইভেট কী ব্যাবহার করে পড়তে পারবেন, অন্য কেউই পারবেনা। তবে মানুষ যেটা দেখবে তা হল ট্রানজেকশনের পরিমাণ। তবে কার অর্থ কার কাছে গিয়েছে সেটা এভাবে জানা যাবেনা। কেননা শুধুমাত্র এড্রেস দিয়ে চলে যাবে টাকা। কোন পরিচয় থাকবেনা।

নিচের ছবিতে দেখা যাবে একটা ট্রানজেকশান দেখতে কেমন। ব্লকচেইনের প্রত্যেকটা ব্লক সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয়। একবার চেইনে একটা ব্লক যোগ হয়ে গেলে সেটাতে কোন প্রকারের পরিবর্তন অসম্ভব। ব্লকগুলো পাশাপাশি তাদের সৃষ্টির ক্রমানুসারে বসে। প্রত্যেকটা ব্লক তার আগে কোন ব্লক আছ সেটা জানে। এভাবে একটা ব্লকের সাথে আরেকটা কানেক্টেড। ব্লকচেইন ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড সিস্টেম, অর্থাৎ সারা পৃথিবীতে বলতে গেলে একই ব্লকচেইনের সব ইউজার বা ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষ ইউজারদের কাছে একেবারে কার্বন কপি আছে। কাজেই একটা বা শ-খানেক সার্ভার বা কম্পিউটার একসাথে নস্ট হয়ে গেলেও ব্লকচেইনের কিছুই হবেনা।

ক্রিপটোকারেন্সিঃ
আমাদের প্রচলিত মুদ্রার মত ক্রিপ্টোকারেন্সি ও এক প্রকার মুদ্রা বা বিনিময় মাধ্যম। অর্থাৎ প্রচলিত মুদ্রা যেমন, ডলার, পাউন্ড, টাকা ইত্যাদি দিয়ে যে কাজ করা যায়, ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়েও সেই একই কাজ করা যায়। ব্লকচেইন টেকনোলজির মাধ্যমে লেনদেনের জন্য এই ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করা হয়। এইরকম মুদ্রা অনেক আছে, যেমন বিটকয়েন, বিটক্যাশ, মোনেরো, লাইটকয়েন ইত্যাদি। আমাদের মুদ্রা যেমন, ডলার, পাউণ্ড, টাকা ইত্যাদির দাম বিভিন্ন সময় ওঠানামা করে, এগুলোর ক্ষেত্রেও তাই, অর্থাৎ ক্রয়/বিক্রয় মূল্য ওঠানামা করে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি
ক্রিপ্টোকারেন্সি
তো এতক্ষণে নিশ্চইয় বুঝতে পেরেছেন ক্রিপ্টোকারেন্সি মানে কি। চলুন এবার তাহলে ক্রিপ্টোকারেন্সির কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

ক্রিপ্টোকারেন্সি ( যেমন ধরুন, বিটকয়েন) একটি নেটওয়ার্কের মতো। প্রতিটি পিয়ারের সমস্ত লেনদেনের সম্পূর্ণ ইতিহাস এবং এইভাবে প্রতিটি অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্সের রেকর্ড আছে। যেমন একটি ট্রান্সজেকশন ফাইল বলছে, "শামছুল x পরিমাণ বিটকয়েন অ্যালিস্কে দেয়" এবং এটি শামছুল হকের ব্যাক্তিগর কী দ্বারা সাক্ষরিত। এটি মৌলিক পাবলিক কী ক্রিপ্টোগ্রাফি। স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে একটি লেনদেন পুরো নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি এক পিয়ার থেকে অন্য পিয়ারে পাঠানো হয়। এটি মৌলিক P2P প্রযুক্তি। নিচের ইনফোগ্রাফ থেকে ধারণা পাওয়া যাবে কিভাবে ব্লকচেইন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি কাজ করে। ছবিটিতে ক্লিক করলে বড় আকারে দেখঅ যাবে।

Blockchain Infographic [www.pwc.com]
Blockchain Infographic [www.pwc.com]
লেনদেনটি অতি দ্রুত সম্পন্ন হয়। তবে নির্দিষ্ট সময় পরে নিশ্চিত হয়। অনেকটা কোন একাউন্ট অ্যাকটিভ করার মাধ্যমে কনফার্ম করার মতো। এই কনফার্ম বা নিশ্চিতকরণ ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যতক্ষণ লেনদেন অনিশ্চিত হয় ততক্ষণ, এটি মুলতুবি আছে এবং জাল করা হতে পারে। যখন একটি লেনদেন নিশ্চিত করা হয়, এটি পুরোপুরিভাবে লেজারে সেট করা হয়। এটিকে আর সংশোধন করা যাবেনা, মুছে ফেলা যাবে না। অর্থাৎ লেজারের তথ্য আর আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন না। এই প্রসেসটিই মূলত ব্লকচেইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা আগেই আলোচনা করা হয়েছে।
শুধুমাত্র মাইনাররা ট্রানজেকশন নিশ্চিত করতে পারবেন। মূলত ক্রিপ্টোকারেন্সি নেটওয়ার্কে এটিই মাইনারদের কাজ। তারা ট্রানজেকশন গ্রহন করে, লেজারে জমা রাখার পর নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে দেয়। যখনি মাইনার কর্তৃক ট্রানজেকশন নিশ্চিত করা হয়, তখনি সেটা অপরিবর্তনীয় ব্লকচেইনের অংশ হয়ে যায়। এই কাজের জন্য মাইনাররা ক্রিপ্টোকারেন্সির টোকেন (ফী বলা যায়) লাভ করে (যেমন: বিটকয়েন)। যেহেতু মাইনরদের কার্যকলাপ ক্রিপ্টোকুরেন্স-সিস্টেমের একক সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাই আমরা মাইনরদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবো।

প্রচলিত সকল মুদ্রার নিয়ন্ত্রক হল কোন দেশের সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারি হোক বা আমেরিকার মত প্রাইভেট হোক, দেশের অর্থনীতি এবং আরও অন্যান্য কিছু বিষয় বিবেচনা করে নতুন কারেন্সি তৈরি করতে পারে। সোজা বাংলায় নতুন 'ব্যাংক নোট' ছাপতে দিতে পারে। অর্থাৎ সেটা নিয়ন্ত্রকেরা নিজেদের ইচ্ছামত করতে পারে, কার লাভ কার ক্ষতি সেটা নিয়ে তাদের মাথা না ঘামালেও তাদের চলে অনেকসময়। যেমন, আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টাকা ছাপা হওয়ার কারনে আমাদের মুদ্রাস্ফীতি আছে।

কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে তৈরি হয়। এখানে নতুন কারেন্সি বা বিটকয়েন আসে প্রতি ১০ মিনিটে একটি ক্রিপ্টোগ্রাফিক পাজল সমাধান করার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। আর এই পাজল প্রতিযোগিতাই হয় মাইনারদের মাধ্যমে।

যারা এনক্রিপশান সম্পর্কে জানে, তাদের কাছে SHA256 এনক্রিপশান পরিচিত হওয়ার কথা। যারা পরিচিত না, এটুকু জানলেই হবে, যে কোন ডেটাকে SHA256 এ যদি এনক্রিপ্ট করা হয় তাহলে ওই ডেটার জন্য একটা হ্যাশ পাওয়া যায়। হ্যাশ হল বোঝার সুবিধার্থে, "000001beeca3785d515897041af0a7" এরকম কিছু একটা। এখন এই ডেটা থেকে যদি অতি সামান্য কোন কিছুও পরিবর্তন হয়, তাহলে একটি ভিন্ন হ্যাশ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ এভাবে এনক্রিপ্ট করলে নির্দিষ্ট একটা ডেটার জন্য হ্যাশ সর্বদা একই হবে, এবং সবার কম্পিউটারেই একই হবে।

এখন লক্ষ করি, উপরে যে হ্যাশটা আমি ব্যবহার করেছি ওখানে শুরুতে ৫টা জিরো আছে। এটা ইচ্ছাকৃত। এবং এটাই সেই ক্রিপটোগ্রাফিক পাজল যেটার কথা একটু আগে বলেছি। প্রতি মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে বিটকয়েনের ব্লকচেইনে অসংখ্য লেনদেন চলছে। ব্লকচেইনে নতুন একটা ব্লক যোগ হওয়ার পর থেকে আনুমানিক ১০ মিনিট ধরে পেন্ডিং ট্রানজেকশনের ডেটা বিটকয়েন সিস্টেমের সকল মাইনারদের কম্পিউটারে জমতে থাকে। তো কথা হচ্ছে মাইনার মানে আমরা নিজেরা এবং আমরা কম্পিউটার নিয়ে বসে আছি পাজল সমাধান করার জন্য।

এখন আমাদের বা মাইনারদের টার্গেট হল, যে ডেটা আমাদের কাছে এই মুহূর্তে আছে সেটা, আগের ব্লকের হ্যাশ এবং তার সাথে আরেকটা Random Number (এখানে একে Nonce = Number Used Once বলা হয়) মিলিয়ে উপরের মত শুরুতে ৫টা জিরো আছে এরকম প্যাটার্নের একটা হ্যাশ খুঁজে বের করা। এই ৫টা জিরো কেন? এটাকে বলা হয়, ডিফিকাল্টি লেভেল, অর্থাৎ শুরুতে কয়টা জিরো বসবে সেটা আসলে পাজলটা সমাধান করা কত কঠিন সেটা নির্দেশ করে।

এভাবে মুহূর্তের মধ্যে সারা পৃথিবীতে হাজার হাজার মাইনার তাদের কম্পিউটারে সেই কাঙ্ক্ষিত হ্যাশ খুঁজে বের করার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। এই প্রসেস আসলে কোন বিশেষ অ্যালগরিদম বা বুদ্ধি দিয়ে জেতা যাবেনা। একেবারে বাংলা পদ্ধতিতে একটার পর একটা Nonce বা এক্সপ্রেশন প্রয়োগ করে চেক করতে হবে সেই প্যাটার্নের হ্যাশ পাওয়া গেল কিনা।

এই প্রতিযোগিতায় যে মাইনার সবার আগে এই হ্যাশ খুঁজে বের করতে পারে যে জয়ী। হ্যাশ খুঁজে পাওয়া মানে হল, নতুন একটা ব্লকচেইনের জন্য নতুন একটা ব্লক তৈরি হওয়া। চমৎকার না? বাকি মাইনার যারা জিততে পারলোনা তাদের কাজ হল, বিজয়ী মাইনারের রেজাল্ট সঠিক কিনা সেটা ভেরিফাই করা। এভাবে সম্ভবত ৫১.৭% মাইনার ভেরিফাই করে দিলে তখন, নতুন ব্লকটা একটা পরীক্ষিত বা সঠিক ব্লক হিসাবে ব্লকচেইনে যোগ হয়ে যায়।

বিটকয়েন কিভাবে কাজ করে তার একটা ভিজুয়াল আইডিয়া নিচের ভিডিও থেকে পাওয়া যেতে পারে।


বাংলায় ব্লকচেইন নিয়ে যত লিখা আছে তার মাঝে মিডিয়ামের ব্লকচেইন এ ভবিষ্যৎ! লিখাটি সবচেয়ে বেশি সহজ এবং ভালো বলে মনে হয়েছে আমার। সকল তথ্য খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অবশ্যপাঠ্য!

ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে অনেক আলোচনা করা হলো।ক্রিপ্টোকারেন্সির অনেক ধরণের প্রকারভেদ আছে।যদি বিটকয়েন অধিক ব্যবহৃত ক্রিপ্টোকারেন্সি।এছাড়াও অনেক ধরণের ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে।

অন্যদিকে ক্রিপ্টোকারেন্সির সিকিউরিটি নিয়েও অনেকের সন্দেহ থাকতে পারে। বাকী সব ক্রিপ্টোকারেন্সি, ক্রিপ্টোকারেন্সির নিরাপত্তা এবং ভবিষৎ নিয়ে আগামী পর্বে আলোচনা করা হবে। সবাইকে সেই পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে আজকে এখানেই শেষ করছি।অনলাইনে লেনদেনে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা বিটকয়েন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার হয়ে আসছে বেশ কয়েক বছর থেকে এবং দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই ‘ক্রিপটোকারেন্সি’। বাংলাদেশেও সম্প্রতি এর লেনদেন শুরু হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বিটকয়েনের আইনি কোনো ভিত্তি নেই। আর ঝুঁকি এড়াতে এ দিয়ে লেনদেন কিংবা এর প্রসারে সহায়তা কিংবা প্রচার থেকে বিরত থাকতে সবাইকে অনুরোধ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার প্রচলন করে। এ ধরনের মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি নামে পরিচিতি পায়। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সে ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেওয়া হয় বিটকয়েন।এছাড়াও আছে ইথিরিয়াম, রিপেল, লাইটকয়েন। তবে সবার থেকে জনপ্রিয় বিটকয়েন।
কিন্তু বিটকয়েন কী? আর কীভাবেই বা কাজ করে বিটকয়েন? আসুন তা জেনে নেয়া যাক-

বিটকয়েন কী?
উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, বিটকয়েন হল এক ধরনের ‘মুদ্রা’ যা দিয়ে অনলাইনে লেনদেন করা যায়। এটিকে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ক্রিপটোগ্রাফিক কারেন্সি বলা হয়। মূলত এটি হল ওপেন সোর্স ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রোটকলের মাধ্যমে লেনদেন হওয়া সাংকেতিক মুদ্রা। বিটকয়েনের সবথেকে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এটি লেনদেনের জন্য কোন ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না। আর তাই প্রয়োজন হয় না কোন অনুমোদনেরও। আর ইন্টারনেটে লেনদেনকারীদের নিকট খুবই জনপ্রিয় বিটকয়েন।

ইতিহাস
অস্ট্রেলিয়ার এক কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ী সাতোশি নাকামোতো ২০০৮ সালে এই মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন করেন। তিনি এ মুদ্রা ব্যবস্থাকে পিয়ার-টু-পিয়ার লেনদেন নামে অভিহিত করেন।বিটকয়েনের লেনদেনটি বিটকয়েন মাইনার নামে একটি সার্ভার কর্তৃক সুরক্ষিত থাকে। পিয়ার-টু-পিয়ার যোগাযোগ ব্যাবস্থায় যুক্ত থাকা একাধিক কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মধ্যে বিটকয়েন লেনদেন হলে এর কেন্দ্রীয় সার্ভার ব্যবহারকারীর লেজার হালনাগাদ করে দেয়। একটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে নতুন বিটকয়েন উৎপন্ন হয়। ২১৪০ সাল পর্যন্ত নতুন সৃষ্ট বিটকয়েনগুলো প্রত্যেক চার বছর পরপর অর্ধেকে নেমে আসবে। ২১৪০ সালের পর ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন তৈরী হয়ে গেলে আর কোন নতুন বিটকয়েন তৈরী করা হবে।

কার্যপ্রণালী
বিটকয়েনের লেনদেন হয় পিয়ার টু পিয়ার বা গ্রাহক থেকে গ্রাহকের কম্পিউটারে। আগেই বলা হয়েছে এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান নেই। বিটকয়েনের সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অনলাইনে একটি উন্মুক্ত সোর্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে। বিটকয়েন মাইনারের মাধ্যমে যেকেউ বিটকয়েন উৎপন্ন করতে পারে। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় অনুমানযোগ্য এবং সীমিত। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার সাথে সাথে এটি গ্রাহকের ডিজিটাল ওয়ালেটে সংরক্ষিত থাকে। এই সংরক্ষিত বিটকয়েন যদি গ্রাহক কর্তৃক অন্য কারও একাউন্টে পাঠানো হয় তাহলে এই লেনদেনের জন্য একটি স্বতন্ত্র ইলেক্ট্রনিক সিগনেচার তৈরী হয়ে যায় যা অন্যান্য মাইনার কর্তৃক নিরীক্ষিত হয় এবং নেটওয়ার্কের মধ্যে গোপন অথচ সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত হয়। একই সাথে গ্রাহকদের বর্তমান লেজার কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে হালনাগাদ হয়। বিটকয়েন দিয়ে কোন পণ্য কেনা হলে তা বিক্রেতার একাউন্টে পাঠানো হয় এবং বিক্রেতা পরবর্তীতে সেই বিটকয়েন দিয়ে পুনরায় পণ্য কিনতে পারে, অপরদিকে সমান পরিমাণ বিটকয়েন ক্রেতার লেজার থেকে কমিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যেক চার বছর পর পর বিটকয়েনের মোট সংখ্যা পুনঃনির্ধারন করা হয় যাতে করে বাস্তব মুদ্রার সাথে সামঞ্জস্য রাখা যায়।

সুবিধা-অসুবিধা
অনলাইনে যারা লেনদেন করেন তাদের জন্য খুবই সুবিধাজনক বিটকয়েন। যাদের বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন করার মত সুযোগ নেই বা ক্রেডিট কার্ড নেই তাদের জন্যও ব্যাপক উপকারি এ বিটকয়েন। তবে কোন ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান না থাকা এবং এর কার্যক্রম তদারকি করার কোন সুযোগ না থাকায় অপরাধীদের কাছেও খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিটকয়েন। বৈধ লেনদেনের পাশাপাশি অবৈধ লেনদেনেও ব্যবহৃত হয় বিটকয়েন। জুয়া খেলা বা বাজি ধরা, অবৈধ পণ্য কেনা-বেচা ইত্যাদির লেনদেনে ব্যবহৃত হয় বিটকয়েন।মাদক চোরাচালান এবং অর্থপাচার কাজেও বিটকয়েনের ব্যবহার আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আলোচনা-সমালোচনা
সম্প্রতি কানাডার ভ্যানক্যুভারে বিটকয়েন এর প্রথম এটিএম মেশিন চালু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এটি বিটকয়েনকে আরও আগিয়ে নিয়ে যাবে। মাদক, চোরাচালান অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা ও অন্যান্য বেআইনি ব্যবহার ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডীয় সরকার বিটকয়েনের গ্রাহকদের নিবন্ধনের আওতায় আনার চিন্তাভাবনা করছে। অন্যদিকে অনেক দেশই অবস্থান নিচ্ছে বিটকয়েনের বিরুদ্ধে। দিও বিটকয়েন ডিজিটাল কারেন্সি হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিপরীতে এর দর মারাত্মক ওঠানামা, দুষ্প্রাপ্যতা এবং ব্যবসায় এর সীমিত ব্যবহারের কারণে অনেকেই এর সমালোচনা করেন।এখন যুগ ভার্চুয়াল মুদ্রা বা বিটকয়েনের। কিন্তু কি এই ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল মুদ্রা? ডিজিটাল মুদ্রার আদান-প্রদান হয় অনলাইনে। বিনিময়ের সব তথ্য গোপন থাকে, বেশির ভাগ সময়েই থাকে অজ্ঞাত। ধরুন, আপনার অর্থ আছে, কিন্তু পকেটে নেই। ব্যাংকে বা সিন্দুকেও সেই অর্থ রাখা হয়নি। রাখা হয়েছে ইন্টারনেটে। কোনো দিন ছুঁয়েও দেখতে পারবেন না অনলাইনে রাখা ওই অর্থ। শুধু ভার্চ্যুয়াল জগতের এ মুদ্রাকেই বলা হয় ডিজিটাল মুদ্রা বা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা।

ডিজিটাল মুদ্রার আদান-প্রদান হয় অনলাইনে। বিনিময়ের সব তথ্য গোপন থাকে, বেশির ভাগ সময়েই থাকে অজ্ঞাত। এ ধরনের ডিজিটাল মুদ্রাকে বলা হয় ক্রিপ্টোকারেন্সি। এ ধরনের মুদ্রার বিনিময়ে ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি নামের একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে প্রচলিত ভাষা বা সংকেতে লেখা তথ্য এমন একটি কোডে লেখা হয়, যা ভেঙে তথ্যের নাগাল পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতিতে ব্যবহারকারী ছাড়া অন্য কারও কোনো কেনাকাটা বা তহবিল স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া বেশ কঠিন।

এরপরও ডিজিটাল মুদ্রার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা ঘটে গেছে গত শুক্রবার। টোকিওভিত্তিক ডিজিটাল মুদ্রার বিনিময় প্রতিষ্ঠান কয়েনচেকের কম্পিউটার ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক হ্যাক করে মোট ৫৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার মূল্যমানের ডিজিটাল মুদ্রা খোয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২ লাখ ৬০ হাজার গ্রাহক। তবে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের খোয়া যাওয়া অর্থের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার আশ্বাস জানিয়েছে কয়েনচেক। হ্যাকিংয়ে অর্থ চুরির ঘটনায় নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা নিয়ে তোপের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোপনে ও নিরাপদে যোগাযোগের জন্য ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছিল। গাণিতিক তত্ত্ব ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিপ্টোগ্রাফিরও উন্নতি হয়েছে। এতে অনলাইনে ডিজিটাল মুদ্রা সংরক্ষণ ও আদান-প্রদানের বিষয়টি আরও নিরাপদ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

অবশ্য এত নিরাপত্তা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে ডিজিটাল মুদ্রার বিভিন্ন বিনিময় প্রতিষ্ঠানে বেশ কটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল মুদ্রা হিসেবে বিটকয়েনের আবির্ভাব ঘটে। বর্তমানে ইন্টারনেটে এক হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে। কয়েনচেক থেকে চুরি হয়েছে স্বল্প পরিচিত মুদ্রা এনইএম। গত বছরের ডিসেম্বরে নাইসহ্যাশ নামের স্লোভেনিয়ার একটি কোম্পানির মাত কোটি ডলারের বিটকয়েন চুরি হয়। বিটকয়েন চুরির ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালেও। এরও আগে ২০১৪ সালে মুদ্রা চুরির শিকার হয়েছিল আরেক বিনিময় প্রতিষ্ঠান এমটিগক্স। তাদের নেটওয়ার্ক থেকে ৪০ কোটি ডলার চুরি গিয়েছিল। চুরির ঘটনা স্বীকার করার পর ওই প্রতিষ্ঠান শেষে বন্ধই হয়ে যায়।

ডিজিটাল মুদ্রা কোনগুলো?
বিশ্বে এখন হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু আছে। তবে বিনিময় মূল্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে নিচের ডিজিটাল মুদ্রাগুলো:

বিটকয়েন: এখন পর্যন্ত চালু থাকা ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিটকয়েন। এর বিনিময় মূল্যও সবচেয়ে বেশি। সাতোশি নাকামোতো ২০০৯ সালে বিটকয়েন তৈরি করেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বিটকয়েনের বাজার পুঁজির পরিমাণ ছিলে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার। কিছুদিন আগে একটি বিটকয়েনের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২০ হাজার ডলার। তবে চলতি বছরে বিনিময় মূল্যের এই হার প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায়।

এথেরিয়াম: ২০১৫ সালে তৈরি হয় এথেরিয়াম। বিটকয়েনের মতো এই মুদ্রারও নিজস্ব হিসাবব্যবস্থা আছে। বিনিময় মূল্যের দিক থেকে এটি দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে বিটকয়েনের পরই আছে এথেরিয়াম। গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার বাজারে পুঁজির পরিমাণ প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০১৬ সালে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর এটি দুটি মুদ্রায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এর বিনিময় মূল্য ৮৪০ ডলারে পৌঁছেছিল। তবে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর প্রতিটি এথেরিয়াম মুদ্রা ১০ সেন্টে বিক্রির ঘটনাও ঘটেছিল।

রিপল: ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রিপল। শুধু ক্রিপ্টোকারেন্সি নয়, অন্যান্য ধরনের লেনদেনও করা যায় এই ব্যবস্থায়। প্রচলিত ধারার বিভিন্ন ব্যাংকও এই ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করছে। বাজারে ১০ বিলিয়ন ডলারের পুঁজি আছে রিপলের।

লাইটকয়েন: বিটকয়েনের সঙ্গে বেজায় মিল আছে লাইটকয়েনের। তবে বিটকয়েনের চেয়ে দ্রুত লেনদেন করা যায় লাইটকয়েনে। এর বাজার মূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার।

‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা-পদ্ধতিতে প্রতিটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্লকচেইন’ নামের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। ছবি: রয়টার্স
‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা-পদ্ধতিতে প্রতিটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্লকচেইন’ নামের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। ছবি: রয়টার্স

কীভাবে কাজ করে ডিজিটাল মুদ্রা?
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিপ্টোকারেন্সি একধরনের বিকেন্দ্রীকৃত প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইনে নিরাপদে অর্থ পরিশোধ করা যায়। আমানতকারীর নাম গোপন রেখে এবং ব্যাংকে না গিয়েই অর্থ জমা রাখা যায়।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থার মতো সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল মুদ্রা ছাপায় না। ‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা পদ্ধতিতে একেকটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত এক বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘ব্লকচেইন’। এই ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ লেনদেনসহ বন্ড, স্টক ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদের কেনাকাটাও করা যায়।

ব্যবহারকারীরা অনলাইনে ব্রোকারদের কাছ থেকেও বিভিন্ন ডিজিটাল মুদ্রা কিনতে পারেন। অনলাইনে ‘ক্রিপ্টোগ্রাফিক ওয়ালেট’ নামক নিরাপদ স্থানে রাখা যায় এই মুদ্রা।

নির্দিষ্ট ডিজিটাল মুদ্রা যত বেশি মানুষ কেনে, সেই মুদ্রার বাজার দর তত বাড়ে। এভাবেই শেয়ার বাজারের মতো নিয়মিত ওঠানামা করে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময় মূল্য। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবহারকারী পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন থাকে বলে অনেক সময় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার বেশি দেখা যায়।

বিশ্বে এখন হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু রয়েছে। তবে বিনিময় মূল্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বিটকয়েন।

কেন ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোকারেন্সি?
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচয় গোপন ও লেনদেন ব্যবস্থায় কঠোর নিরাপত্তা—এই দুটি বিষয়ই হলো ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রাব্যবস্থায় আকৃষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ। এই ব্যবস্থায় একবার লেনদেন হওয়ার পর তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। একই সঙ্গে লেনদেনের খরচ কম হওয়ায় এটি গ্রাহকদের কাছে বেশি নির্ভরযোগ্যতা অর্জন করেছে। এর প্রযুক্তিব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকৃত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, সবার হাতের কাছেই থাকে ডিজিটাল মুদ্রা। যেখানে প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থায় ব্যাংক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্ট না খুললে সেবা পান না কোনো গ্রাহক।

ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে আকৃষ্ট হওয়ার আরেকটি কারণ হলো এতে কম বিনিয়োগ করেই ব্যাপক লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ, প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থার তুলনায় ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর বিনিময় মূল্যের ওঠা-নামা বেশি। তাই রাতারাতি ধনী হওয়ার সুযোগও থাকে। ঠিক এই কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিটকয়েন বা অন্যান্য শীর্ষ ডিজিটাল মুদ্রায় বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে।

তবে এর কিন্তু উল্টো দিকও আছে। অর্থাৎ দর বেড়ে গেলে যেমন ধনী হওয়ার সুযোগ আছে, তেমনি হুট করে দর নেমে গেলে রাস্তাতেও নামতে পারেন। আবার কঠোর গোপনীয়তা থাকায় অবৈধ কর্মকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট লেনদেনে পছন্দের শীর্ষে আছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। তাই বিনিয়োগকারীদের এসব বিষয়ে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে।বর্তমানে ফেসবুক কিংবা ইউটিউবের কল্যাণে আমাদের সবাই হয়তো কখনো না কখনো বিটকয়েন শব্দটি শুনেছি। কিন্তু বিটকয়েন সম্পর্কে বিস্তারিত আমরা অনেকেই ভালোভাবে জানি না। বিটকয়েন কী? কীভাবে কাজ করে? কী কী কাজে ব্যবহার করা হয়? চলুন জেনে নেয়া যাক এসব প্রশ্নের উত্তর।

বিটকয়েন কী?
বিটকয়েন হলো একধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি। আর ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো এমন একধরনের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থা যার কোনো ফিজিক্যাল বা বাস্তব রূপ নেই। বিটকয়েন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি।



বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো বিটকয়েন; Source: crypto-news.net

সাধারণত আমরা টাকা-পয়সা লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি তৃতীয় পক্ষীয় সংস্থার আশ্রয় নেই। যেমন মনে করুন, আপনি আপনার বন্ধুকে কিছু টাকা পাঠাবেন। এক্ষেত্রে আপনি আপনার ফোনের বিকাশ/রকেট একাউন্ট থেকে আপনার বন্ধুকে টাকাটি পাঠিয়ে দিলেন। এখানে আপনি প্রেরক, আপনার বন্ধু প্রাপক এবং বিকাশ/রকেট তৃতীয় পক্ষ, যে কিনা সমস্ত লেনদেন প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করলো এবং এর জন্য কিছু চার্জ আদায় করলো।

কিন্তু বিটকয়েন এমন একটি মুদ্রা ব্যবস্থা যাতে অর্থ আদান-প্রদানের জন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হয় না। প্রেরকের কাছ থেকে সরাসরি বিটকয়েন প্রাপকের কাছে পৌছে যায়। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘পিয়ার টু পিয়ার’ (peer-to-peer)। এক্ষেত্রে সমস্ত লেনদেন প্রক্রিয়াটি হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করে যা অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি প্রক্রিয়া। যেহেতু কোনো তৃতীয় পক্ষীয় সংস্থা এই লেনদেন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে না, সেহেতু বিটকয়েনের লেনদেনের গতিবিধি নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। অর্থাৎ কে কাকে বিটকয়েন পাঠাচ্ছে তার পরিচয় কেউ জানতে পারে না। পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখেই বিটকয়েন লেনদেন করা যায়।

যেভাবে এলো এই বিটকয়েন
২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট। এই দিনে ইন্টারনেট জগতে ‘bitcoin.com’ নামের একটি ওয়েবসাইটের ডোমেইন রেজিস্টার করা হয়। এ বছরেরই নভেম্বর মাসে ‘সাতোশি নাকামোতো’ ছদ্মনামে এক ব্যক্তি বা একটি দল ‘Bitcoin: A Peer-to-Peer Electronic Cash System’ নামে একটি গবেষণাপত্র অনলাইনে প্রকাশ করেন। এই গবেষণাপত্রটিতেই সর্বপ্রথম বিটকয়েন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে সাতোশি নাকামোতো বিটকয়েন তৈরি করার সফটওয়্যারের কোড অনলাইনে রিলিজ করেন। তৈরি হয় বিটকয়েন ‘মাইনিং’ এর সফটওয়্যার। বিটকয়েন মাইনিং হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বিটকয়েন তৈরি করা হয়। ২০০৯ সালের এই জানুয়ারি মাসেই সাতোশি বিশ্বের প্রথম বিটকয়েন তৈরি করেন।


কে এই সাতোশি নাকামোতো তা কেউ জানে না; Source: coindesk.com

বহু বার বহুজনকে সাতোশি নাকামোতো সন্দেহে গ্রেফতার করা হলেও প্রকৃত সাতোশি নাকামোতো কে, বা এই নামের পেছনে কে বা কারা আছে তা আজও জানা যায়নি।

যেভাবে কাজ করে বিটকয়েন
সাধারণ মুদ্রার মতো বিটকয়েন আপনি হাতে নিয়ে লেনদেন করতে পারবেন না। কোনো ব্যাংক কিংবা প্রতিষ্ঠান এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার কারণে বিটকয়েন প্রেরক থেকে সরাসরি প্রাপকের ‘ওয়ালেটে’ চলে যায়। ওয়ালেট হচ্ছে আপনার মানিব্যাগের মতো, যেখানে আপনার নিজের বিটকয়েন জমা থাকে। ওয়ালেট অনলাইন কিংবা অফলাইন দু’ধরনেরই হয়। অনলাইন ওয়ালেট ব্যবহারকারী তার স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটারের মাধ্যমে ব্যবহার করতে পারে।


স্মার্টফোনের মাধ্যমেই ব্যবহার করা যায় ডিজিটাল ওয়ালেট; Source: letstalkpayments.com

প্রতিটি ওয়ালেটের একটি নির্দিষ্ট এড্রেস বা ঠিকানা থাকে। ঠিকানাটি সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড হয় বলে এটি মনে রাখা অসম্ভব। বিটকয়েন লেনদেনের জন্য ব্যবহারকারী তার এই ঠিকানাটি ব্যবহার করে থাকেন।


ব্লকচেইনে জমা থাকে সব লেনদেনের হিসাব; Source: idmmag.com

এক এড্রেস থেকে অন্য এড্রেসে বিটকয়েন পাঠালে তা সাথে সাথে একটি উন্মুক্ত খতিয়ানে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়, যার নাম ‘ব্লকচেইন’। এটি এমনই বিশাল একটি খতিয়ান ব্যবস্থা যাতে এযাবতকালে যত বিটকয়েন লেনদেন হয়েছে তার সবগুলোরই রেকর্ড রয়েছে। প্রতিটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে নেটওয়ার্কে একটি নতুন বিট কয়েন তৈরি হয়। পদ্ধতিকেই বলা হয় বিটকয়েন মাইনিং।

যেভাবে করা হয় বিটকয়েন মাইনিং
বিটকয়েন মাইনিং একটি জটিল প্রক্রিয়া। একটি নির্দিষ্ট মাইনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হয়। এজন্য প্রয়োজন হয় উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কম্পিউটার। কম্পিউটারের সিপিইউ এবং জিপিইউ ব্যবহার করে জটিল কিছু গাণিতিক এলগরিদমের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।


একটি বিটকয়েন মাইনিং রিগ; Source: youtube.com

প্রতিটি বিটকয়েন লেনদেন করা হলে তা ব্লকচেইনে লিপিবদ্ধ হয়। এ সময় বিটকয়েন মাইনাররা মাইনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের বৈধতা নির্ণয় করেন। আর এ সময়ই একটি নতুন বিটকয়েন তৈরি হয়।

বিটকয়েন লেনদেন ও নতুন বিটকয়েন তৈরির এই সমস্ত প্রক্রিয়াটিই ঘটে অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে। ফলে এতে কোনো ধরনের ছলচাতুরী কিংবা প্রতারণার সম্ভবনা থাকে না। উভয় পক্ষেরই পরিচয় থাকে গোপন।

বিটকয়েনের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য
বিটকয়েন একটি সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীভূত মুদ্রা ব্যবস্থা। সরকার কিংবা কোনো কর্তৃপক্ষ এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার ফলে এখানে প্রত্যেক ব্যবহারকারী তাদের বিটকয়েনের প্রকৃত মালিক। অন্য কেউ তাদের বিটকয়েন নেটওয়ার্কের মালিকানা নিতে পারে না।
বিটকয়েন লেনদেনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিই হয় নাম বিহীনভাবে। একজন বিটকয়েন ব্যবহারকারী একাধিক বিটকয়েন একাউন্ট খুলতে পারে। এসব একাউন্ট খোলার জন্য কোনো ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন ব্যবহারকারীর নাম, ঠিকানা ইত্যাদি প্রয়োজন হয় না। ফলে ব্যবহারকারীর প্রকৃত পরিচয় থাকে গোপন।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে। প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড ব্লকচেইনে জমা থাকে যা যে কেউ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে যখন তখন দেখতে সক্ষম। ফলে এখানে কোনো দুর্নীতির সুযোগ নেই।
বিটকয়েন একাউন্ট খোলা খুবই সহজ। এক্ষেত্রে সাধারণ ব্যাংক একাউন্ট খোলার মতো কোনো ঝামেলাযুক্ত ফর্ম পূরণ করতে হয় না। কোন এক্সট্রা ফি-ও প্রয়োজন হয় না। কোনো কাগজপত্রও জমা দেওয়া লাগে না।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া খুবই দ্রুত। পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই বিটকয়েন পাঠানো হোক না কেন তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাপকের কাছে পৌঁছে যাবে।
বিটকয়েনের কিছু অসুবিধা
বিটকয়েন সম্পূর্ণ অফেরতযোগ্য। অর্থাৎ কেউ ভুল করে কোনো ভুল ঠিকানায় বিটকয়েন পাঠিয়ে দিলে তা আর ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে না। প্রেরক-প্রাপক উভয়ের পরিচয়ই সম্পূর্ণ গোপন থাকে। ফলে অনেক অপরাধমূলক কাজে বিটকয়েন ব্যবহার করা সম্ভব। অবৈধ পণ্যের কেনা বেচাতেও বিটকয়েন ব্যবহৃত হয়। ইন্টারনেটের গোপন অংশ ডার্ক ওয়েবের সমস্ত লেনদেন হয় বিটকয়েনের মাধ্যমে।
বিটকয়েনের মূল্য অনেকটাই অস্থিতিশীল। কখনো বিশাল পরিমাণে বাড়ে তো কখনো বিশাল ধস নামে।
বর্তমান বিশ্বে বিটকয়েনের মূল্য ও বাংলাদেশে এর অবস্থা
বিটকয়েন প্রথম চালু হওয়ার পর থেকে দিন দিন এর মূল্য বেড়েই চলেছে। ২০১১ সালে বিটকয়েনের বাজারমূল্য সর্বপ্রথম ০.৩০ ডলার থেকে ৩২ ডলারে উঠে। এরপর ২০১৩ সালে এর দাম উঠে যায় ২৬৬ ডলারে। এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বিটকয়েনের দাম। ২০১৬ সালের শেষের দিকে এই দাম চলে আসে ৬০০ ডলারের উপরে। এরপর ২০১৭ সালে বিটকয়েনের দাম বেড়ে যায় রেকর্ড পরিমাণ। প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার করে বাড়তে বাড়তে এ বছরের নভেম্বরে বিটকয়েনের দাম উঠে যায় ৯,০০০ ডলারের কাছাকাছি। আর এই ডিসেম্বর মাসেই এই দাম বেড়ে পরিণত হয় ১৫,০০০ ডলারেরও বেশিতে যা সত্যিই অভূতপূর্ব একটি ঘটনা।


বিটকয়েনের দাম বেড়েছে ব্যাপক হারে; Source: coindesk.com

বিশ্বের বহু দেশে বিটকয়েন অনেক জনপ্রিয়। ওয়ার্ডপ্রেস, মাইক্রোসফট, উইকিপিডিয়া, ওভারস্টকের মতো বিশ্বের প্রায় ত্রিশ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান বিটকয়েন গ্রহণ করে। দিন দিন এর জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বাড়ছে। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস পর্যন্ত বিটকয়েন নিয়ে মন্তব্য করছেন, “Bitcoin is better than currency“।

এখন চলুন দেখি বাংলাদেশে বিটকয়েনের অবস্থান নিয়ে। বাংলাদেশ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসাবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনে অন্তর্ভুক্ত হয় ২০১৪ সালের ১৫ আগস্টে। কিন্তু বিটকয়েন ফাউন্ডেশনে যুক্ত হওয়ার ঠিক এক মাসের মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় বিটকয়েনের সকল লেনদেনের উপর। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দেশে বিটকয়েনের সকল প্রকার লেনদেন থেকে জনগণকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানায়। অর্থাৎ বিটকয়েন লেনদেনকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশে বিটকয়েনের উপর এই নিষেধাজ্ঞা বজায় রয়েছে।ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ (bitcoin) এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। গত ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনের সদস্যপদ পেয়েছে।

ঢাকা: ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ (bitcoin) এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। গত ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনের সদস্যপদ পেয়েছে। কিন্তু বিটকয়েন কি, কিসের জন্য? কি কাজে প্রয়োজন? এরকম নানাবিধ প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে বাংলানিউজ তার পাঠকদের জন্য নিয়ে এসেছে বিটকয়েন-এর উপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন। প্রথম পর্বে থাকছে ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ পরিচিতি।

সাধারণত কাগজের তৈরি প্রচলিত মুদ্রা বা এ সংশ্লিষ্ট কোন ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্বলিত বস্তু ব্যবহার করে বাস্তব জীবনে এবং অনলাইনে লেনদেন সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো আপাতঃ দৃষ্টিতে কোন প্রকারের সমস্যা ছাড়াই মিটিয়ে ফেলা যায়। তবে বর্তমানে ব্যবহৃত এটিএম কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড অথবা অন্য ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্বলিত বস্তুগুলো ব্যবহারে দুটি বড় সমস্যা রয়েছে।

এসবে লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহক ও গ্রহিতা উভয়কে তৃতীয় কোন পক্ষের উপর ‘ট্রাস্ট’ বা আস্থা রাখতে হয়, উদাহরণস্বরূপ ব্যাংক। তৃতীয় পক্ষ এই ব্যাংকে উভয় পক্ষ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের মুদ্রা পরিশোধ করে, যেটিকে ইংরেজীতে বলে ‘ডাবল স্পেন্ডিং’।ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা ইথিরিয়াম জনপ্রিয় হচ্ছে। বিটকয়েনের পরেই রয়েছে এ মুদ্রা। বিটকয়েনের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই? প্রযুক্তি দুনিয়ায় হইচই তোলা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা বিটকয়েন। অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার প্রচলন করে। এ ধরনের মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি নামে পরিচিতি পায়। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সে ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেওয়া হয় বিটকয়েন।

ক্রিপ্টোকারেন্সির দুনিয়ায় বাজার দখলের দিক থেকে বিটকয়েনের পরের অবস্থানে আছে ইথিরিয়াম। ২০১৩ সালে ভিটালিক বুটকারিন প্রতিষ্ঠিত এ ভার্চ্যুয়াল মুদ্রায় ইথার নামের একটি ক্রিপটোকারেন্সি ব্যবহৃত হয়। অর্থ পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে ও মুদ্রা ব্যবহৃত হয়।

ইথিরিয়াম কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। এ মুদ্রা দিয়ে বিনিয়োগ, বিভিন্ন চুক্তিসহ নানা কাজ করা হয়। ইথিরিয়াম সাধারণত ‘স্মার্ট কনট্রাক্টসে’ ব্যবহৃত হয়। এ স্মার্ট কনট্রাক্টস হচ্ছে লেনদেনের প্রোটোকল বা প্রোগ্রাম যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই চুক্তির শর্ত পূরণ করে।

২০১৬ সাল থেকে এ মুদ্রা দিয়ে লেনদেন হয় এবং বর্তমানে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা জগতে ২৭ শতাংশ দখল করে রেখেছে। ডয়চে ব্যাংক ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের এক প্রতিবেদনে অনুযায়ী, প্রতি বছর এক কোটি ৮০ লাখ ইথারের বেশি অনুমোদন করা হয় না। ইথারের অনুমোদন সীমিত হওয়ায় প্রতিবছর এর চাহিদা বাড়ছে এবং আপেক্ষিক মুদ্রাস্ফীতি হার কম থাকে। এটি মূলত ইথহ্যাস মাইনিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে।

দ্য বিটকয়েন বিগ ব্যাং নামের বইয়ের লেখক ব্রায়ান কেলি লিখেছেন, ইথিরিয়ামের লক্ষ্য হচ্ছে কোনো ডেভেলপারের জন্য স্মার্ট কন্ট্রাক্ট লেখা সহজ করা বা ইথিরিয়াম ব্লকচেইনে চলবে। এ প্রযুক্তির প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না।
ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে আলোচনার আগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সচরাচর ব্যবহৃত মুদ্রাব্যবস্থা নিয়ে একটু জেনে নেয়া যাকঃ

বহু বছর আগে থেকেই মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী জিনিসপত্র লেনদেন করে আসছে। লেনদেনের সবচেয়ে প্রাচীন এবং অধিক প্রচলিত প্রথার মধ্যে অন্যতম ছিলো বিনিময় প্রথা। কিন্তু মানদন্ডের বিচারে সেখানে বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছেন। ধরা যাক, ফল ব্যবসায়ী শফিক সাহেবের একবস্তা চাল লাগবে এবং বিনিময়ে তাকে এক বস্তা তুলা দিতে হবে। কিন্তু শফিক সাহেবের কাছে কোন তুলা নেই। যেহেতু শফিক সাহেবের কাছে কোন তুলা নেই, তাহলে এখানে বিনিময় কার্য সম্পন্ন হতে পারছেনা।

বিনিময় প্রথার এই সমস্যা থেকে নিস্তার পাওয়ার লক্ষ্যে সবাই এমন একটা প্রথা উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো, যেখানে সব ধরণের পণ্যের একটা আদর্শ মূল্য থাকবে। উদাহরণ হিসেবে গোল্ডের কথা বলা যেতে পারে। অনেক বছর আগে থেকে এখনো গোল্ডকে সম্পদ পরিমাপের একটা একক হিসাবে ধরা হত। আগে সরাসরি গোল্ড লেনদেন হত, সেটা একসময় মানুষের প্রয়োজনমত কাগজের মুদ্রা ব্যাবস্থায় রূপ নেয়।

এভাবে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রা যেমন, টাকা, ডলার, পাউণ্ড, ইউরো ইত্যাদি এসেছে। দেশের অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই মুদ্রা ছেপে বাজারে ছাড়তে পারে মানুষের ব্যবহারের জন্য। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন বা সম্পদ আদান প্রদান সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো দেশের আইন অনুযায়ী সামলানোর জন্য তৈরি হয়েছে ব্যাংক বা ব্যাংকিং সিস্টেম। কিন্তু এতে করেও সমস্যার সমাধান হয়নি। পৃথিবীর ইতিহাসে বড় বড় ব্যাংক ডাকাতির ভয়াবহ গল্পগুলো শুনলে কার না হৃদয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়! তবুও সময় বয়ে যায়, আর মানুষ ও দমে যাবার পাত্র নয়। নিজের প্রয়োজনে তারা আবিষ্কার করে একের পর এক বিস্ময়। আজকে আমরা তেমনি এক বিস্ময়ের কথা বলবো।

বর্তমানে প্রচলিত নানান মূদ্রা
বর্তমানে প্রচলিত নানান মূদ্রা
মূল আলোচনায় যাবার আগে আমরা একটা কাল্পনিক দৃশ্যপট কল্পনা করার চেষ্টা করবো।

খুব ছোটবেলা থেকে আপনার অনেক ধরণের শখ আছে। এর মধ্যে অন্যতম শখ হচ্ছে আর্ট এন্ড কালচার। অর্থাৎ এই আধুনিকায়ন সভ্যতায় বসে আপনার দুষ্প্রাপ্য চিত্রকর্মের প্রতি বিশেষ আগ্রহ আছে। খুব ছোটবেলা থেকে সংগ্রহ করছেন। তাই নিজের এত বছরে সংগ্রহ করা চিত্রকর্ম নিয়ে আপনার ছোটখাটো একটা মিউজিয়াম আছে। কথায় আছে শখের তোলা ৮০, এর জন্য মূল্য ও দিতে হয় অনেক। এসব জিনিস সংগ্রহ করা এবং নিজের সংগ্রহে রাখা দুইটারই ঝামেলা অনেক। কারন এসবের উপর নানা ধরনের লোকজনের নজর থাকে, অনেক সময় এগুলো নিয়ে বড় ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধ কিংবা দুর্ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় শেষের দিকে অথবা চাকরি নিয়ে বেশ ব্যস্ত কিংবা এখন আর আগের মতো পেইন নিতে চান না, আবার শখের জিনিষ ছাড়তে ও চান না। তাই বেশ কিছুদিন ধরে ভাবছেন এমন কোন উপায় নিয়ে যা দিয়ে সংগ্রহের সকল আর্টগুলো এমনভাবে সংরক্ষণ করা যায় যেন,

প্রথমেই পণ্যের গুণগত মান নিশ্চায়ন করা।
আর্থিক লেনদেন এবং আইনগত ব্যাপারগুলো বাড়িতে বসে, বিনা ঝামেলায়, নীরবে এবং স্বল্পতম সময়ে করে ফেলা।
বিক্রয় করার সময় একটি স্বচ্ছ লেনদেন প্রক্রিয়া।
পণ্যের কঠোর নিরাপত্তা।
অর্থাৎ যদি কোন চোর কোনক্রমে আপনার কোন আর্ট চুরি করে বাইরে বিক্রি করতে যায়, তাহলে যেন সে চোরাই জিনিস বিক্রির দায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং চোর যদি পালিয়েও যায়, যে সেটা কিনেছে সে ধরা পড়ে চোরাই জিনিস কেনার অপরাধে।

বিনিময় প্রথা তো আর আপনার এই চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থা চাইলেই আপনার এই সমস্যা দূর করতে পারে। কিন্তু ঐ যে বললাম বড় বড় ব্যাংক ডাকাতির করুণ ইতিহাসের কথা। অন্যদিকে আপনি যে ধরণের আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যাংকগুলো এই মুহূর্তে দিতে পারছে না।

আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি সেই সাপেক্ষে ব্যাংকের ভূমিকা একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করি।

আপাতত আমরা এখানে ব্যাংকের গুরুত্ব বুঝানোর চেষ্টা করি। ধরে নিচ্ছি, আপনি আপনার চিত্রকলা সম্পর্কিত কোন কাজের জন্য মিসরের কোন এক পত্নতাত্ত্বিক ব্যবসায়ীর কাছে টাকা পাঠাবেন। তো আপনি জানেন কিংবা শুনেছেন যে প্রায় সময় তারা টাকা নিয়ে অনেক ধরণের অনৈতিক পথের আশ্রয় নেয়। তাই আপনি তাদের টাকা দিতে ঠিক ভরসা পাচ্ছেন না। যদি টাকা নিয়ে সে ব্যবসায়ী অস্বীকার করে! সুতরাং এক্ষেত্রে আপনার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান লাগবে যেখানে আপনি স্বাচ্ছন্দে টাকা আদান-প্রদান করতে পারবেন। অর্থাৎ আপনার অ্যাকাউন্টের টাকা আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিসরের সেই ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে যাবে, এবং প্রতিষ্ঠানটি সেই লেনদেনের রেকর্ড রাখবে যাতে এই লেনদেন নিয়ে দুইজনের কেউ কোন প্রশ্ন না তুলতে পারে। এই মাঝখানের প্রতিষ্ঠানটি হল ব্যাংক।

কেমন হতো যদি আপনি তৃতীয় কোন পক্ষ কিংবা ব্যাংকের আশ্রয় না নিয়ে কোন উপায়ে মিসরের সেই ব্যবসায়ীকে টাকা দিতে পারতেন? এখানে আমরা মূলত একটি প্রসেস নিয়ে চিন্তা করছি যা একটি ব্যাংকের চাইতে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে কোন অর্থ লেনদেন নিশ্চিত করবে। এমনকি সেই সিস্টেমে থাকবে না হ্যাংকি কিংবা কোন ধরণের লুটপাটের সম্ভাবনা।

আসলে এই প্রযুক্তির নাম হল ব্লকচেইন, যাকে বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তিবিদ ভবিষ্যতের ব্যাংকিং টেকনোলজি হিসাবে দেখছেন এবং কিছু প্রভাবশালী দেশের কয়েকটি ব্যাংক ইতোমধ্যে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এই প্রযুক্তির পেছনে। ব্লকচেইন সিস্টেম এবং সেটার জন্য প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন ডিজাইন ও ডেভেলপ করেন যিনি তার নাম সাতোশি নাকামোতো। 'যিনি' কথাটা এখানে সম্ভবত ঠিক নয়, কেননা সাতোশি নাকামতোর পরিচয় এখনও জানা যায়নি। এটা হতে পারো কোন ব্যাক্তি, গোষ্ঠি, প্রতিষ্ঠার বা কোম্পানির কোডনেম।

এতক্ষণ পর্যন্ত ঠিকই ছিলো। এখন নিশ্চইয় ভাবছেন এই ব্লকচেইন আবার কি! তাহলে চলুন ব্লক চেইন নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

ব্লকচেইন কি?
মোটামুটি নির্দিষ্ট একটি সময়ের মধ্যে সারা পৃথিবী জুড়ে যত অর্থের বা সম্পদের লেনদেন হচ্ছে সেই লেনদেনের সকল এনক্রিপটেড তথ্য একসাথে নিয়ে একটা ব্লক বানানো হয়। সেই ব্লক দিয়ে ক্রমানুসারে সাজানো সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয় একটা ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড লেজারকেই মূলত ব্লকচেইন বলা হয়। কেমন যেন ঘোলাটে লাগছে সব কিছু, তাইনা! বিটকয়েন কে আমরা এখন অনেকেই চিনি। এখানে আমরা যে ব্লক চেইনের কথা বলছি তার একটা উদাহরণ হচ্ছে বিটকয়েন ব্লকচেইন। বিটকয়েন একটা ক্রিপ্টোকারেন্সি যা কোন একটা ব্লকচেইন ব্যবহার করে পরিচালিত হয়।

ব্যাংকের যাবতীয় লেনদেন রেকর্ড করার জন্য সকল শাখায় একটা বড় সাইজের খাতা থাকে। আর যে ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে, তাদের এই রেকর্ড থাকে ডেটাবেইজে। হয়তো, সেই পুরানো খাতাতেও থাকে। এই বড় সাইজের খাতাটাকে বলে লেজার। তো একটা ভ্যালিড ট্রানকেজশানের জন্য অবশ্যই ব্যাংকের লেজারে সেটার এন্ট্রি থাকতে হবে। ব্লকচেইন এরকম একটা লেজার, যেখানে পাশাপাশি একটার পর একটা এরকম অনেকগুলো ব্লক থাকে। প্রত্যেকটা ব্লকের ভিতর থাকে একটা সময়ে মাঝে সারা পৃথিবীতে যত ট্রানজেকশান হয়েছে সেটার সকল ডেটা। এই ডেটা ওপেন কিন্তু এনক্রিপ্টেড অর্থাৎ সবাই দেখতে পারবে এই ডেটা কিন্তু পড়তে গেলে প্রাইভেট কী লাগবে। অর্থাৎ আপনি যদি এখানে ট্রাঞ্জেকশান করে থাকেন তাহলে শুধুমাত্র আপনি এখান থেকে আপনার ট্রানজেকশনের সকল তথ্য সেটার প্রাইভেট কী ব্যাবহার করে পড়তে পারবেন, অন্য কেউই পারবেনা। তবে মানুষ যেটা দেখবে তা হল ট্রানজেকশনের পরিমাণ। তবে কার অর্থ কার কাছে গিয়েছে সেটা এভাবে জানা যাবেনা। কেননা শুধুমাত্র এড্রেস দিয়ে চলে যাবে টাকা। কোন পরিচয় থাকবেনা।

নিচের ছবিতে দেখা যাবে একটা ট্রানজেকশান দেখতে কেমন। ব্লকচেইনের প্রত্যেকটা ব্লক সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয়। একবার চেইনে একটা ব্লক যোগ হয়ে গেলে সেটাতে কোন প্রকারের পরিবর্তন অসম্ভব। ব্লকগুলো পাশাপাশি তাদের সৃষ্টির ক্রমানুসারে বসে। প্রত্যেকটা ব্লক তার আগে কোন ব্লক আছ সেটা জানে। এভাবে একটা ব্লকের সাথে আরেকটা কানেক্টেড। ব্লকচেইন ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড সিস্টেম, অর্থাৎ সারা পৃথিবীতে বলতে গেলে একই ব্লকচেইনের সব ইউজার বা ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষ ইউজারদের কাছে একেবারে কার্বন কপি আছে। কাজেই একটা বা শ-খানেক সার্ভার বা কম্পিউটার একসাথে নস্ট হয়ে গেলেও ব্লকচেইনের কিছুই হবেনা।

ক্রিপটোকারেন্সিঃ
আমাদের প্রচলিত মুদ্রার মত ক্রিপ্টোকারেন্সি ও এক প্রকার মুদ্রা বা বিনিময় মাধ্যম। অর্থাৎ প্রচলিত মুদ্রা যেমন, ডলার, পাউন্ড, টাকা ইত্যাদি দিয়ে যে কাজ করা যায়, ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়েও সেই একই কাজ করা যায়। ব্লকচেইন টেকনোলজির মাধ্যমে লেনদেনের জন্য এই ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করা হয়। এইরকম মুদ্রা অনেক আছে, যেমন বিটকয়েন, বিটক্যাশ, মোনেরো, লাইটকয়েন ইত্যাদি। আমাদের মুদ্রা যেমন, ডলার, পাউণ্ড, টাকা ইত্যাদির দাম বিভিন্ন সময় ওঠানামা করে, এগুলোর ক্ষেত্রেও তাই, অর্থাৎ ক্রয়/বিক্রয় মূল্য ওঠানামা করে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি
ক্রিপ্টোকারেন্সি
তো এতক্ষণে নিশ্চইয় বুঝতে পেরেছেন ক্রিপ্টোকারেন্সি মানে কি। চলুন এবার তাহলে ক্রিপ্টোকারেন্সির কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

ক্রিপ্টোকারেন্সি ( যেমন ধরুন, বিটকয়েন) একটি নেটওয়ার্কের মতো। প্রতিটি পিয়ারের সমস্ত লেনদেনের সম্পূর্ণ ইতিহাস এবং এইভাবে প্রতিটি অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্সের রেকর্ড আছে। যেমন একটি ট্রান্সজেকশন ফাইল বলছে, "শামছুল x পরিমাণ বিটকয়েন অ্যালিস্কে দেয়" এবং এটি শামছুল হকের ব্যাক্তিগর কী দ্বারা সাক্ষরিত। এটি মৌলিক পাবলিক কী ক্রিপ্টোগ্রাফি। স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে একটি লেনদেন পুরো নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি এক পিয়ার থেকে অন্য পিয়ারে পাঠানো হয়। এটি মৌলিক P2P প্রযুক্তি। নিচের ইনফোগ্রাফ থেকে ধারণা পাওয়া যাবে কিভাবে ব্লকচেইন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি কাজ করে। ছবিটিতে ক্লিক করলে বড় আকারে দেখঅ যাবে।

Blockchain Infographic [www.pwc.com]
Blockchain Infographic [www.pwc.com]
লেনদেনটি অতি দ্রুত সম্পন্ন হয়। তবে নির্দিষ্ট সময় পরে নিশ্চিত হয়। অনেকটা কোন একাউন্ট অ্যাকটিভ করার মাধ্যমে কনফার্ম করার মতো। এই কনফার্ম বা নিশ্চিতকরণ ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যতক্ষণ লেনদেন অনিশ্চিত হয় ততক্ষণ, এটি মুলতুবি আছে এবং জাল করা হতে পারে। যখন একটি লেনদেন নিশ্চিত করা হয়, এটি পুরোপুরিভাবে লেজারে সেট করা হয়। এটিকে আর সংশোধন করা যাবেনা, মুছে ফেলা যাবে না। অর্থাৎ লেজারের তথ্য আর আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন না। এই প্রসেসটিই মূলত ব্লকচেইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা আগেই আলোচনা করা হয়েছে।
শুধুমাত্র মাইনাররা ট্রানজেকশন নিশ্চিত করতে পারবেন। মূলত ক্রিপ্টোকারেন্সি নেটওয়ার্কে এটিই মাইনারদের কাজ। তারা ট্রানজেকশন গ্রহন করে, লেজারে জমা রাখার পর নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে দেয়। যখনি মাইনার কর্তৃক ট্রানজেকশন নিশ্চিত করা হয়, তখনি সেটা অপরিবর্তনীয় ব্লকচেইনের অংশ হয়ে যায়। এই কাজের জন্য মাইনাররা ক্রিপ্টোকারেন্সির টোকেন (ফী বলা যায়) লাভ করে (যেমন: বিটকয়েন)। যেহেতু মাইনরদের কার্যকলাপ ক্রিপ্টোকুরেন্স-সিস্টেমের একক সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাই আমরা মাইনরদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবো।

প্রচলিত সকল মুদ্রার নিয়ন্ত্রক হল কোন দেশের সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারি হোক বা আমেরিকার মত প্রাইভেট হোক, দেশের অর্থনীতি এবং আরও অন্যান্য কিছু বিষয় বিবেচনা করে নতুন কারেন্সি তৈরি করতে পারে। সোজা বাংলায় নতুন 'ব্যাংক নোট' ছাপতে দিতে পারে। অর্থাৎ সেটা নিয়ন্ত্রকেরা নিজেদের ইচ্ছামত করতে পারে, কার লাভ কার ক্ষতি সেটা নিয়ে তাদের মাথা না ঘামালেও তাদের চলে অনেকসময়। যেমন, আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টাকা ছাপা হওয়ার কারনে আমাদের মুদ্রাস্ফীতি আছে।

কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে তৈরি হয়। এখানে নতুন কারেন্সি বা বিটকয়েন আসে প্রতি ১০ মিনিটে একটি ক্রিপ্টোগ্রাফিক পাজল সমাধান করার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। আর এই পাজল প্রতিযোগিতাই হয় মাইনারদের মাধ্যমে।

যারা এনক্রিপশান সম্পর্কে জানে, তাদের কাছে SHA256 এনক্রিপশান পরিচিত হওয়ার কথা। যারা পরিচিত না, এটুকু জানলেই হবে, যে কোন ডেটাকে SHA256 এ যদি এনক্রিপ্ট করা হয় তাহলে ওই ডেটার জন্য একটা হ্যাশ পাওয়া যায়। হ্যাশ হল বোঝার সুবিধার্থে, "000001beeca3785d515897041af0a7" এরকম কিছু একটা। এখন এই ডেটা থেকে যদি অতি সামান্য কোন কিছুও পরিবর্তন হয়, তাহলে একটি ভিন্ন হ্যাশ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ এভাবে এনক্রিপ্ট করলে নির্দিষ্ট একটা ডেটার জন্য হ্যাশ সর্বদা একই হবে, এবং সবার কম্পিউটারেই একই হবে।

এখন লক্ষ করি, উপরে যে হ্যাশটা আমি ব্যবহার করেছি ওখানে শুরুতে ৫টা জিরো আছে। এটা ইচ্ছাকৃত। এবং এটাই সেই ক্রিপটোগ্রাফিক পাজল যেটার কথা একটু আগে বলেছি। প্রতি মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে বিটকয়েনের ব্লকচেইনে অসংখ্য লেনদেন চলছে। ব্লকচেইনে নতুন একটা ব্লক যোগ হওয়ার পর থেকে আনুমানিক ১০ মিনিট ধরে পেন্ডিং ট্রানজেকশনের ডেটা বিটকয়েন সিস্টেমের সকল মাইনারদের কম্পিউটারে জমতে থাকে। তো কথা হচ্ছে মাইনার মানে আমরা নিজেরা এবং আমরা কম্পিউটার নিয়ে বসে আছি পাজল সমাধান করার জন্য।

এখন আমাদের বা মাইনারদের টার্গেট হল, যে ডেটা আমাদের কাছে এই মুহূর্তে আছে সেটা, আগের ব্লকের হ্যাশ এবং তার সাথে আরেকটা Random Number (এখানে একে Nonce = Number Used Once বলা হয়) মিলিয়ে উপরের মত শুরুতে ৫টা জিরো আছে এরকম প্যাটার্নের একটা হ্যাশ খুঁজে বের করা। এই ৫টা জিরো কেন? এটাকে বলা হয়, ডিফিকাল্টি লেভেল, অর্থাৎ শুরুতে কয়টা জিরো বসবে সেটা আসলে পাজলটা সমাধান করা কত কঠিন সেটা নির্দেশ করে।

এভাবে মুহূর্তের মধ্যে সারা পৃথিবীতে হাজার হাজার মাইনার তাদের কম্পিউটারে সেই কাঙ্ক্ষিত হ্যাশ খুঁজে বের করার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। এই প্রসেস আসলে কোন বিশেষ অ্যালগরিদম বা বুদ্ধি দিয়ে জেতা যাবেনা। একেবারে বাংলা পদ্ধতিতে একটার পর একটা Nonce বা এক্সপ্রেশন প্রয়োগ করে চেক করতে হবে সেই প্যাটার্নের হ্যাশ পাওয়া গেল কিনা।

এই প্রতিযোগিতায় যে মাইনার সবার আগে এই হ্যাশ খুঁজে বের করতে পারে যে জয়ী। হ্যাশ খুঁজে পাওয়া মানে হল, নতুন একটা ব্লকচেইনের জন্য নতুন একটা ব্লক তৈরি হওয়া। চমৎকার না? বাকি মাইনার যারা জিততে পারলোনা তাদের কাজ হল, বিজয়ী মাইনারের রেজাল্ট সঠিক কিনা সেটা ভেরিফাই করা। এভাবে সম্ভবত ৫১.৭% মাইনার ভেরিফাই করে দিলে তখন, নতুন ব্লকটা একটা পরীক্ষিত বা সঠিক ব্লক হিসাবে ব্লকচেইনে যোগ হয়ে যায়।

বিটকয়েন কিভাবে কাজ করে তার একটা ভিজুয়াল আইডিয়া নিচের ভিডিও থেকে পাওয়া যেতে পারে।


বাংলায় ব্লকচেইন নিয়ে যত লিখা আছে তার মাঝে মিডিয়ামের ব্লকচেইন এ ভবিষ্যৎ! লিখাটি সবচেয়ে বেশি সহজ এবং ভালো বলে মনে হয়েছে আমার। সকল তথ্য খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অবশ্যপাঠ্য!

ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে অনেক আলোচনা করা হলো।ক্রিপ্টোকারেন্সির অনেক ধরণের প্রকারভেদ আছে।যদি বিটকয়েন অধিক ব্যবহৃত ক্রিপ্টোকারেন্সি।এছাড়াও অনেক ধরণের ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে।

অন্যদিকে ক্রিপ্টোকারেন্সির সিকিউরিটি নিয়েও অনেকের সন্দেহ থাকতে পারে। বাকী সব ক্রিপ্টোকারেন্সি, ক্রিপ্টোকারেন্সির নিরাপত্তা এবং ভবিষৎ নিয়ে আগামী পর্বে আলোচনা করা হবে। সবাইকে সেই পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে আজকে এখানেই শেষ করছি।অনলাইনে লেনদেনে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা বিটকয়েন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার হয়ে আসছে বেশ কয়েক বছর থেকে এবং দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই ‘ক্রিপটোকারেন্সি’। বাংলাদেশেও সম্প্রতি এর লেনদেন শুরু হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বিটকয়েনের আইনি কোনো ভিত্তি নেই। আর ঝুঁকি এড়াতে এ দিয়ে লেনদেন কিংবা এর প্রসারে সহায়তা কিংবা প্রচার থেকে বিরত থাকতে সবাইকে অনুরোধ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার প্রচলন করে। এ ধরনের মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি নামে পরিচিতি পায়। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সে ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেওয়া হয় বিটকয়েন।এছাড়াও আছে ইথিরিয়াম, রিপেল, লাইটকয়েন। তবে সবার থেকে জনপ্রিয় বিটকয়েন।
কিন্তু বিটকয়েন কী? আর কীভাবেই বা কাজ করে বিটকয়েন? আসুন তা জেনে নেয়া যাক-

বিটকয়েন কী?
উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, বিটকয়েন হল এক ধরনের ‘মুদ্রা’ যা দিয়ে অনলাইনে লেনদেন করা যায়। এটিকে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ক্রিপটোগ্রাফিক কারেন্সি বলা হয়। মূলত এটি হল ওপেন সোর্স ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রোটকলের মাধ্যমে লেনদেন হওয়া সাংকেতিক মুদ্রা। বিটকয়েনের সবথেকে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এটি লেনদেনের জন্য কোন ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না। আর তাই প্রয়োজন হয় না কোন অনুমোদনেরও। আর ইন্টারনেটে লেনদেনকারীদের নিকট খুবই জনপ্রিয় বিটকয়েন।

ইতিহাস
অস্ট্রেলিয়ার এক কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ী সাতোশি নাকামোতো ২০০৮ সালে এই মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন করেন। তিনি এ মুদ্রা ব্যবস্থাকে পিয়ার-টু-পিয়ার লেনদেন নামে অভিহিত করেন।বিটকয়েনের লেনদেনটি বিটকয়েন মাইনার নামে একটি সার্ভার কর্তৃক সুরক্ষিত থাকে। পিয়ার-টু-পিয়ার যোগাযোগ ব্যাবস্থায় যুক্ত থাকা একাধিক কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মধ্যে বিটকয়েন লেনদেন হলে এর কেন্দ্রীয় সার্ভার ব্যবহারকারীর লেজার হালনাগাদ করে দেয়। একটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে নতুন বিটকয়েন উৎপন্ন হয়। ২১৪০ সাল পর্যন্ত নতুন সৃষ্ট বিটকয়েনগুলো প্রত্যেক চার বছর পরপর অর্ধেকে নেমে আসবে। ২১৪০ সালের পর ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন তৈরী হয়ে গেলে আর কোন নতুন বিটকয়েন তৈরী করা হবে।

কার্যপ্রণালী
বিটকয়েনের লেনদেন হয় পিয়ার টু পিয়ার বা গ্রাহক থেকে গ্রাহকের কম্পিউটারে। আগেই বলা হয়েছে এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান নেই। বিটকয়েনের সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অনলাইনে একটি উন্মুক্ত সোর্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে। বিটকয়েন মাইনারের মাধ্যমে যেকেউ বিটকয়েন উৎপন্ন করতে পারে। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় অনুমানযোগ্য এবং সীমিত। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার সাথে সাথে এটি গ্রাহকের ডিজিটাল ওয়ালেটে সংরক্ষিত থাকে। এই সংরক্ষিত বিটকয়েন যদি গ্রাহক কর্তৃক অন্য কারও একাউন্টে পাঠানো হয় তাহলে এই লেনদেনের জন্য একটি স্বতন্ত্র ইলেক্ট্রনিক সিগনেচার তৈরী হয়ে যায় যা অন্যান্য মাইনার কর্তৃক নিরীক্ষিত হয় এবং নেটওয়ার্কের মধ্যে গোপন অথচ সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত হয়। একই সাথে গ্রাহকদের বর্তমান লেজার কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে হালনাগাদ হয়। বিটকয়েন দিয়ে কোন পণ্য কেনা হলে তা বিক্রেতার একাউন্টে পাঠানো হয় এবং বিক্রেতা পরবর্তীতে সেই বিটকয়েন দিয়ে পুনরায় পণ্য কিনতে পারে, অপরদিকে সমান পরিমাণ বিটকয়েন ক্রেতার লেজার থেকে কমিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যেক চার বছর পর পর বিটকয়েনের মোট সংখ্যা পুনঃনির্ধারন করা হয় যাতে করে বাস্তব মুদ্রার সাথে সামঞ্জস্য রাখা যায়।

সুবিধা-অসুবিধা
অনলাইনে যারা লেনদেন করেন তাদের জন্য খুবই সুবিধাজনক বিটকয়েন। যাদের বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন করার মত সুযোগ নেই বা ক্রেডিট কার্ড নেই তাদের জন্যও ব্যাপক উপকারি এ বিটকয়েন। তবে কোন ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান না থাকা এবং এর কার্যক্রম তদারকি করার কোন সুযোগ না থাকায় অপরাধীদের কাছেও খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিটকয়েন। বৈধ লেনদেনের পাশাপাশি অবৈধ লেনদেনেও ব্যবহৃত হয় বিটকয়েন। জুয়া খেলা বা বাজি ধরা, অবৈধ পণ্য কেনা-বেচা ইত্যাদির লেনদেনে ব্যবহৃত হয় বিটকয়েন।মাদক চোরাচালান এবং অর্থপাচার কাজেও বিটকয়েনের ব্যবহার আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আলোচনা-সমালোচনা
সম্প্রতি কানাডার ভ্যানক্যুভারে বিটকয়েন এর প্রথম এটিএম মেশিন চালু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এটি বিটকয়েনকে আরও আগিয়ে নিয়ে যাবে। মাদক, চোরাচালান অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা ও অন্যান্য বেআইনি ব্যবহার ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডীয় সরকার বিটকয়েনের গ্রাহকদের নিবন্ধনের আওতায় আনার চিন্তাভাবনা করছে। অন্যদিকে অনেক দেশই অবস্থান নিচ্ছে বিটকয়েনের বিরুদ্ধে। দিও বিটকয়েন ডিজিটাল কারেন্সি হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিপরীতে এর দর মারাত্মক ওঠানামা, দুষ্প্রাপ্যতা এবং ব্যবসায় এর সীমিত ব্যবহারের কারণে অনেকেই এর সমালোচনা করেন।এখন যুগ ভার্চুয়াল মুদ্রা বা বিটকয়েনের। কিন্তু কি এই ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল মুদ্রা? ডিজিটাল মুদ্রার আদান-প্রদান হয় অনলাইনে। বিনিময়ের সব তথ্য গোপন থাকে, বেশির ভাগ সময়েই থাকে অজ্ঞাত। ধরুন, আপনার অর্থ আছে, কিন্তু পকেটে নেই। ব্যাংকে বা সিন্দুকেও সেই অর্থ রাখা হয়নি। রাখা হয়েছে ইন্টারনেটে। কোনো দিন ছুঁয়েও দেখতে পারবেন না অনলাইনে রাখা ওই অর্থ। শুধু ভার্চ্যুয়াল জগতের এ মুদ্রাকেই বলা হয় ডিজিটাল মুদ্রা বা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা।

ডিজিটাল মুদ্রার আদান-প্রদান হয় অনলাইনে। বিনিময়ের সব তথ্য গোপন থাকে, বেশির ভাগ সময়েই থাকে অজ্ঞাত। এ ধরনের ডিজিটাল মুদ্রাকে বলা হয় ক্রিপ্টোকারেন্সি। এ ধরনের মুদ্রার বিনিময়ে ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি নামের একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে প্রচলিত ভাষা বা সংকেতে লেখা তথ্য এমন একটি কোডে লেখা হয়, যা ভেঙে তথ্যের নাগাল পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতিতে ব্যবহারকারী ছাড়া অন্য কারও কোনো কেনাকাটা বা তহবিল স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া বেশ কঠিন।

এরপরও ডিজিটাল মুদ্রার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা ঘটে গেছে গত শুক্রবার। টোকিওভিত্তিক ডিজিটাল মুদ্রার বিনিময় প্রতিষ্ঠান কয়েনচেকের কম্পিউটার ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক হ্যাক করে মোট ৫৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার মূল্যমানের ডিজিটাল মুদ্রা খোয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২ লাখ ৬০ হাজার গ্রাহক। তবে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের খোয়া যাওয়া অর্থের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার আশ্বাস জানিয়েছে কয়েনচেক। হ্যাকিংয়ে অর্থ চুরির ঘটনায় নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা নিয়ে তোপের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোপনে ও নিরাপদে যোগাযোগের জন্য ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছিল। গাণিতিক তত্ত্ব ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিপ্টোগ্রাফিরও উন্নতি হয়েছে। এতে অনলাইনে ডিজিটাল মুদ্রা সংরক্ষণ ও আদান-প্রদানের বিষয়টি আরও নিরাপদ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

অবশ্য এত নিরাপত্তা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে ডিজিটাল মুদ্রার বিভিন্ন বিনিময় প্রতিষ্ঠানে বেশ কটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল মুদ্রা হিসেবে বিটকয়েনের আবির্ভাব ঘটে। বর্তমানে ইন্টারনেটে এক হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে। কয়েনচেক থেকে চুরি হয়েছে স্বল্প পরিচিত মুদ্রা এনইএম। গত বছরের ডিসেম্বরে নাইসহ্যাশ নামের স্লোভেনিয়ার একটি কোম্পানির মাত কোটি ডলারের বিটকয়েন চুরি হয়। বিটকয়েন চুরির ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালেও। এরও আগে ২০১৪ সালে মুদ্রা চুরির শিকার হয়েছিল আরেক বিনিময় প্রতিষ্ঠান এমটিগক্স। তাদের নেটওয়ার্ক থেকে ৪০ কোটি ডলার চুরি গিয়েছিল। চুরির ঘটনা স্বীকার করার পর ওই প্রতিষ্ঠান শেষে বন্ধই হয়ে যায়।

ডিজিটাল মুদ্রা কোনগুলো?
বিশ্বে এখন হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু আছে। তবে বিনিময় মূল্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে নিচের ডিজিটাল মুদ্রাগুলো:

বিটকয়েন: এখন পর্যন্ত চালু থাকা ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিটকয়েন। এর বিনিময় মূল্যও সবচেয়ে বেশি। সাতোশি নাকামোতো ২০০৯ সালে বিটকয়েন তৈরি করেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বিটকয়েনের বাজার পুঁজির পরিমাণ ছিলে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার। কিছুদিন আগে একটি বিটকয়েনের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২০ হাজার ডলার। তবে চলতি বছরে বিনিময় মূল্যের এই হার প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায়।

এথেরিয়াম: ২০১৫ সালে তৈরি হয় এথেরিয়াম। বিটকয়েনের মতো এই মুদ্রারও নিজস্ব হিসাবব্যবস্থা আছে। বিনিময় মূল্যের দিক থেকে এটি দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে বিটকয়েনের পরই আছে এথেরিয়াম। গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার বাজারে পুঁজির পরিমাণ প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০১৬ সালে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর এটি দুটি মুদ্রায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এর বিনিময় মূল্য ৮৪০ ডলারে পৌঁছেছিল। তবে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর প্রতিটি এথেরিয়াম মুদ্রা ১০ সেন্টে বিক্রির ঘটনাও ঘটেছিল।

রিপল: ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রিপল। শুধু ক্রিপ্টোকারেন্সি নয়, অন্যান্য ধরনের লেনদেনও করা যায় এই ব্যবস্থায়। প্রচলিত ধারার বিভিন্ন ব্যাংকও এই ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করছে। বাজারে ১০ বিলিয়ন ডলারের পুঁজি আছে রিপলের।

লাইটকয়েন: বিটকয়েনের সঙ্গে বেজায় মিল আছে লাইটকয়েনের। তবে বিটকয়েনের চেয়ে দ্রুত লেনদেন করা যায় লাইটকয়েনে। এর বাজার মূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার।

‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা-পদ্ধতিতে প্রতিটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্লকচেইন’ নামের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। ছবি: রয়টার্স
‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা-পদ্ধতিতে প্রতিটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্লকচেইন’ নামের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। ছবি: রয়টার্স

কীভাবে কাজ করে ডিজিটাল মুদ্রা?
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিপ্টোকারেন্সি একধরনের বিকেন্দ্রীকৃত প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইনে নিরাপদে অর্থ পরিশোধ করা যায়। আমানতকারীর নাম গোপন রেখে এবং ব্যাংকে না গিয়েই অর্থ জমা রাখা যায়।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থার মতো সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল মুদ্রা ছাপায় না। ‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা পদ্ধতিতে একেকটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত এক বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘ব্লকচেইন’। এই ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ লেনদেনসহ বন্ড, স্টক ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদের কেনাকাটাও করা যায়।

ব্যবহারকারীরা অনলাইনে ব্রোকারদের কাছ থেকেও বিভিন্ন ডিজিটাল মুদ্রা কিনতে পারেন। অনলাইনে ‘ক্রিপ্টোগ্রাফিক ওয়ালেট’ নামক নিরাপদ স্থানে রাখা যায় এই মুদ্রা।

নির্দিষ্ট ডিজিটাল মুদ্রা যত বেশি মানুষ কেনে, সেই মুদ্রার বাজার দর তত বাড়ে। এভাবেই শেয়ার বাজারের মতো নিয়মিত ওঠানামা করে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময় মূল্য। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবহারকারী পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন থাকে বলে অনেক সময় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার বেশি দেখা যায়।

বিশ্বে এখন হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু রয়েছে। তবে বিনিময় মূল্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বিটকয়েন।

কেন ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোকারেন্সি?
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচয় গোপন ও লেনদেন ব্যবস্থায় কঠোর নিরাপত্তা—এই দুটি বিষয়ই হলো ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রাব্যবস্থায় আকৃষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ। এই ব্যবস্থায় একবার লেনদেন হওয়ার পর তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। একই সঙ্গে লেনদেনের খরচ কম হওয়ায় এটি গ্রাহকদের কাছে বেশি নির্ভরযোগ্যতা অর্জন করেছে। এর প্রযুক্তিব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকৃত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, সবার হাতের কাছেই থাকে ডিজিটাল মুদ্রা। যেখানে প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থায় ব্যাংক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্ট না খুললে সেবা পান না কোনো গ্রাহক।

ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে আকৃষ্ট হওয়ার আরেকটি কারণ হলো এতে কম বিনিয়োগ করেই ব্যাপক লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ, প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থার তুলনায় ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর বিনিময় মূল্যের ওঠা-নামা বেশি। তাই রাতারাতি ধনী হওয়ার সুযোগও থাকে। ঠিক এই কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিটকয়েন বা অন্যান্য শীর্ষ ডিজিটাল মুদ্রায় বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে।

তবে এর কিন্তু উল্টো দিকও আছে। অর্থাৎ দর বেড়ে গেলে যেমন ধনী হওয়ার সুযোগ আছে, তেমনি হুট করে দর নেমে গেলে রাস্তাতেও নামতে পারেন। আবার কঠোর গোপনীয়তা থাকায় অবৈধ কর্মকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট লেনদেনে পছন্দের শীর্ষে আছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। তাই বিনিয়োগকারীদের এসব বিষয়ে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে।বর্তমানে ফেসবুক কিংবা ইউটিউবের কল্যাণে আমাদের সবাই হয়তো কখনো না কখনো বিটকয়েন শব্দটি শুনেছি। কিন্তু বিটকয়েন সম্পর্কে বিস্তারিত আমরা অনেকেই ভালোভাবে জানি না। বিটকয়েন কী? কীভাবে কাজ করে? কী কী কাজে ব্যবহার করা হয়? চলুন জেনে নেয়া যাক এসব প্রশ্নের উত্তর।

বিটকয়েন কী?
বিটকয়েন হলো একধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি। আর ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো এমন একধরনের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থা যার কোনো ফিজিক্যাল বা বাস্তব রূপ নেই। বিটকয়েন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি।



বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো বিটকয়েন; Source: crypto-news.net

সাধারণত আমরা টাকা-পয়সা লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি তৃতীয় পক্ষীয় সংস্থার আশ্রয় নেই। যেমন মনে করুন, আপনি আপনার বন্ধুকে কিছু টাকা পাঠাবেন। এক্ষেত্রে আপনি আপনার ফোনের বিকাশ/রকেট একাউন্ট থেকে আপনার বন্ধুকে টাকাটি পাঠিয়ে দিলেন। এখানে আপনি প্রেরক, আপনার বন্ধু প্রাপক এবং বিকাশ/রকেট তৃতীয় পক্ষ, যে কিনা সমস্ত লেনদেন প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করলো এবং এর জন্য কিছু চার্জ আদায় করলো।

কিন্তু বিটকয়েন এমন একটি মুদ্রা ব্যবস্থা যাতে অর্থ আদান-প্রদানের জন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হয় না। প্রেরকের কাছ থেকে সরাসরি বিটকয়েন প্রাপকের কাছে পৌছে যায়। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘পিয়ার টু পিয়ার’ (peer-to-peer)। এক্ষেত্রে সমস্ত লেনদেন প্রক্রিয়াটি হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করে যা অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি প্রক্রিয়া। যেহেতু কোনো তৃতীয় পক্ষীয় সংস্থা এই লেনদেন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে না, সেহেতু বিটকয়েনের লেনদেনের গতিবিধি নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। অর্থাৎ কে কাকে বিটকয়েন পাঠাচ্ছে তার পরিচয় কেউ জানতে পারে না। পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখেই বিটকয়েন লেনদেন করা যায়।

যেভাবে এলো এই বিটকয়েন
২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট। এই দিনে ইন্টারনেট জগতে ‘bitcoin.com’ নামের একটি ওয়েবসাইটের ডোমেইন রেজিস্টার করা হয়। এ বছরেরই নভেম্বর মাসে ‘সাতোশি নাকামোতো’ ছদ্মনামে এক ব্যক্তি বা একটি দল ‘Bitcoin: A Peer-to-Peer Electronic Cash System’ নামে একটি গবেষণাপত্র অনলাইনে প্রকাশ করেন। এই গবেষণাপত্রটিতেই সর্বপ্রথম বিটকয়েন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে সাতোশি নাকামোতো বিটকয়েন তৈরি করার সফটওয়্যারের কোড অনলাইনে রিলিজ করেন। তৈরি হয় বিটকয়েন ‘মাইনিং’ এর সফটওয়্যার। বিটকয়েন মাইনিং হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বিটকয়েন তৈরি করা হয়। ২০০৯ সালের এই জানুয়ারি মাসেই সাতোশি বিশ্বের প্রথম বিটকয়েন তৈরি করেন।


কে এই সাতোশি নাকামোতো তা কেউ জানে না; Source: coindesk.com

বহু বার বহুজনকে সাতোশি নাকামোতো সন্দেহে গ্রেফতার করা হলেও প্রকৃত সাতোশি নাকামোতো কে, বা এই নামের পেছনে কে বা কারা আছে তা আজও জানা যায়নি।

যেভাবে কাজ করে বিটকয়েন
সাধারণ মুদ্রার মতো বিটকয়েন আপনি হাতে নিয়ে লেনদেন করতে পারবেন না। কোনো ব্যাংক কিংবা প্রতিষ্ঠান এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার কারণে বিটকয়েন প্রেরক থেকে সরাসরি প্রাপকের ‘ওয়ালেটে’ চলে যায়। ওয়ালেট হচ্ছে আপনার মানিব্যাগের মতো, যেখানে আপনার নিজের বিটকয়েন জমা থাকে। ওয়ালেট অনলাইন কিংবা অফলাইন দু’ধরনেরই হয়। অনলাইন ওয়ালেট ব্যবহারকারী তার স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটারের মাধ্যমে ব্যবহার করতে পারে।


স্মার্টফোনের মাধ্যমেই ব্যবহার করা যায় ডিজিটাল ওয়ালেট; Source: letstalkpayments.com

প্রতিটি ওয়ালেটের একটি নির্দিষ্ট এড্রেস বা ঠিকানা থাকে। ঠিকানাটি সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড হয় বলে এটি মনে রাখা অসম্ভব। বিটকয়েন লেনদেনের জন্য ব্যবহারকারী তার এই ঠিকানাটি ব্যবহার করে থাকেন।


ব্লকচেইনে জমা থাকে সব লেনদেনের হিসাব; Source: idmmag.com

এক এড্রেস থেকে অন্য এড্রেসে বিটকয়েন পাঠালে তা সাথে সাথে একটি উন্মুক্ত খতিয়ানে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়, যার নাম ‘ব্লকচেইন’। এটি এমনই বিশাল একটি খতিয়ান ব্যবস্থা যাতে এযাবতকালে যত বিটকয়েন লেনদেন হয়েছে তার সবগুলোরই রেকর্ড রয়েছে। প্রতিটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে নেটওয়ার্কে একটি নতুন বিট কয়েন তৈরি হয়। পদ্ধতিকেই বলা হয় বিটকয়েন মাইনিং।

যেভাবে করা হয় বিটকয়েন মাইনিং
বিটকয়েন মাইনিং একটি জটিল প্রক্রিয়া। একটি নির্দিষ্ট মাইনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হয়। এজন্য প্রয়োজন হয় উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কম্পিউটার। কম্পিউটারের সিপিইউ এবং জিপিইউ ব্যবহার করে জটিল কিছু গাণিতিক এলগরিদমের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।


একটি বিটকয়েন মাইনিং রিগ; Source: youtube.com

প্রতিটি বিটকয়েন লেনদেন করা হলে তা ব্লকচেইনে লিপিবদ্ধ হয়। এ সময় বিটকয়েন মাইনাররা মাইনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের বৈধতা নির্ণয় করেন। আর এ সময়ই একটি নতুন বিটকয়েন তৈরি হয়।

বিটকয়েন লেনদেন ও নতুন বিটকয়েন তৈরির এই সমস্ত প্রক্রিয়াটিই ঘটে অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে। ফলে এতে কোনো ধরনের ছলচাতুরী কিংবা প্রতারণার সম্ভবনা থাকে না। উভয় পক্ষেরই পরিচয় থাকে গোপন।

বিটকয়েনের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য
বিটকয়েন একটি সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীভূত মুদ্রা ব্যবস্থা। সরকার কিংবা কোনো কর্তৃপক্ষ এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার ফলে এখানে প্রত্যেক ব্যবহারকারী তাদের বিটকয়েনের প্রকৃত মালিক। অন্য কেউ তাদের বিটকয়েন নেটওয়ার্কের মালিকানা নিতে পারে না।
বিটকয়েন লেনদেনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিই হয় নাম বিহীনভাবে। একজন বিটকয়েন ব্যবহারকারী একাধিক বিটকয়েন একাউন্ট খুলতে পারে। এসব একাউন্ট খোলার জন্য কোনো ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন ব্যবহারকারীর নাম, ঠিকানা ইত্যাদি প্রয়োজন হয় না। ফলে ব্যবহারকারীর প্রকৃত পরিচয় থাকে গোপন।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে। প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড ব্লকচেইনে জমা থাকে যা যে কেউ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে যখন তখন দেখতে সক্ষম। ফলে এখানে কোনো দুর্নীতির সুযোগ নেই।
বিটকয়েন একাউন্ট খোলা খুবই সহজ। এক্ষেত্রে সাধারণ ব্যাংক একাউন্ট খোলার মতো কোনো ঝামেলাযুক্ত ফর্ম পূরণ করতে হয় না। কোন এক্সট্রা ফি-ও প্রয়োজন হয় না। কোনো কাগজপত্রও জমা দেওয়া লাগে না।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া খুবই দ্রুত। পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই বিটকয়েন পাঠানো হোক না কেন তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাপকের কাছে পৌঁছে যাবে।
বিটকয়েনের কিছু অসুবিধা
বিটকয়েন সম্পূর্ণ অফেরতযোগ্য। অর্থাৎ কেউ ভুল করে কোনো ভুল ঠিকানায় বিটকয়েন পাঠিয়ে দিলে তা আর ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে না। প্রেরক-প্রাপক উভয়ের পরিচয়ই সম্পূর্ণ গোপন থাকে। ফলে অনেক অপরাধমূলক কাজে বিটকয়েন ব্যবহার করা সম্ভব। অবৈধ পণ্যের কেনা বেচাতেও বিটকয়েন ব্যবহৃত হয়। ইন্টারনেটের গোপন অংশ ডার্ক ওয়েবের সমস্ত লেনদেন হয় বিটকয়েনের মাধ্যমে।
বিটকয়েনের মূল্য অনেকটাই অস্থিতিশীল। কখনো বিশাল পরিমাণে বাড়ে তো কখনো বিশাল ধস নামে।
বর্তমান বিশ্বে বিটকয়েনের মূল্য ও বাংলাদেশে এর অবস্থা
বিটকয়েন প্রথম চালু হওয়ার পর থেকে দিন দিন এর মূল্য বেড়েই চলেছে। ২০১১ সালে বিটকয়েনের বাজারমূল্য সর্বপ্রথম ০.৩০ ডলার থেকে ৩২ ডলারে উঠে। এরপর ২০১৩ সালে এর দাম উঠে যায় ২৬৬ ডলারে। এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বিটকয়েনের দাম। ২০১৬ সালের শেষের দিকে এই দাম চলে আসে ৬০০ ডলারের উপরে। এরপর ২০১৭ সালে বিটকয়েনের দাম বেড়ে যায় রেকর্ড পরিমাণ। প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার করে বাড়তে বাড়তে এ বছরের নভেম্বরে বিটকয়েনের দাম উঠে যায় ৯,০০০ ডলারের কাছাকাছি। আর এই ডিসেম্বর মাসেই এই দাম বেড়ে পরিণত হয় ১৫,০০০ ডলারেরও বেশিতে যা সত্যিই অভূতপূর্ব একটি ঘটনা।


বিটকয়েনের দাম বেড়েছে ব্যাপক হারে; Source: coindesk.com

বিশ্বের বহু দেশে বিটকয়েন অনেক জনপ্রিয়। ওয়ার্ডপ্রেস, মাইক্রোসফট, উইকিপিডিয়া, ওভারস্টকের মতো বিশ্বের প্রায় ত্রিশ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান বিটকয়েন গ্রহণ করে। দিন দিন এর জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বাড়ছে। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস পর্যন্ত বিটকয়েন নিয়ে মন্তব্য করছেন, “Bitcoin is better than currency“।

এখন চলুন দেখি বাংলাদেশে বিটকয়েনের অবস্থান নিয়ে। বাংলাদেশ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসাবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনে অন্তর্ভুক্ত হয় ২০১৪ সালের ১৫ আগস্টে। কিন্তু বিটকয়েন ফাউন্ডেশনে যুক্ত হওয়ার ঠিক এক মাসের মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় বিটকয়েনের সকল লেনদেনের উপর। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দেশে বিটকয়েনের সকল প্রকার লেনদেন থেকে জনগণকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানায়। অর্থাৎ বিটকয়েন লেনদেনকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশে বিটকয়েনের উপর এই নিষেধাজ্ঞা বজায় রয়েছে।ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ (bitcoin) এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। গত ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনের সদস্যপদ পেয়েছে।

ঢাকা: ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ (bitcoin) এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। গত ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনের সদস্যপদ পেয়েছে। কিন্তু বিটকয়েন কি, কিসের জন্য? কি কাজে প্রয়োজন? এরকম নানাবিধ প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে বাংলানিউজ তার পাঠকদের জন্য নিয়ে এসেছে বিটকয়েন-এর উপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন। প্রথম পর্বে থাকছে ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ পরিচিতি।

সাধারণত কাগজের তৈরি প্রচলিত মুদ্রা বা এ সংশ্লিষ্ট কোন ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্বলিত বস্তু ব্যবহার করে বাস্তব জীবনে এবং অনলাইনে লেনদেন সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো আপাতঃ দৃষ্টিতে কোন প্রকারের সমস্যা ছাড়াই মিটিয়ে ফেলা যায়। তবে বর্তমানে ব্যবহৃত এটিএম কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড অথবা অন্য ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্বলিত বস্তুগুলো ব্যবহারে দুটি বড় সমস্যা রয়েছে।

এসবে লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহক ও গ্রহিতা উভয়কে তৃতীয় কোন পক্ষের উপর ‘ট্রাস্ট’ বা আস্থা রাখতে হয়, উদাহরণস্বরূপ ব্যাংক। তৃতীয় পক্ষ এই ব্যাংকে উভয় পক্ষ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের মুদ্রা পরিশোধ করে, যেটিকে ইংরেজীতে বলে ‘ডাবল স্পেন্ডিং’।ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা ইথিরিয়াম জনপ্রিয় হচ্ছে। বিটকয়েনের পরেই রয়েছে এ মুদ্রা। বিটকয়েনের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই? প্রযুক্তি দুনিয়ায় হইচই তোলা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা বিটকয়েন। অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার প্রচলন করে। এ ধরনের মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি নামে পরিচিতি পায়। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সে ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেওয়া হয় বিটকয়েন।

ক্রিপ্টোকারেন্সির দুনিয়ায় বাজার দখলের দিক থেকে বিটকয়েনের পরের অবস্থানে আছে ইথিরিয়াম। ২০১৩ সালে ভিটালিক বুটকারিন প্রতিষ্ঠিত এ ভার্চ্যুয়াল মুদ্রায় ইথার নামের একটি ক্রিপটোকারেন্সি ব্যবহৃত হয়। অর্থ পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে ও মুদ্রা ব্যবহৃত হয়।

ইথিরিয়াম কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। এ মুদ্রা দিয়ে বিনিয়োগ, বিভিন্ন চুক্তিসহ নানা কাজ করা হয়। ইথিরিয়াম সাধারণত ‘স্মার্ট কনট্রাক্টসে’ ব্যবহৃত হয়। এ স্মার্ট কনট্রাক্টস হচ্ছে লেনদেনের প্রোটোকল বা প্রোগ্রাম যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই চুক্তির শর্ত পূরণ করে।

২০১৬ সাল থেকে এ মুদ্রা দিয়ে লেনদেন হয় এবং বর্তমানে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা জগতে ২৭ শতাংশ দখল করে রেখেছে। ডয়চে ব্যাংক ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের এক প্রতিবেদনে অনুযায়ী, প্রতি বছর এক কোটি ৮০ লাখ ইথারের বেশি অনুমোদন করা হয় না। ইথারের অনুমোদন সীমিত হওয়ায় প্রতিবছর এর চাহিদা বাড়ছে এবং আপেক্ষিক মুদ্রাস্ফীতি হার কম থাকে। এটি মূলত ইথহ্যাস মাইনিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে।

দ্য বিটকয়েন বিগ ব্যাং নামের বইয়ের লেখক ব্রায়ান কেলি লিখেছেন, ইথিরিয়ামের লক্ষ্য হচ্ছে কোনো ডেভেলপারের জন্য স্মার্ট কন্ট্রাক্ট লেখা সহজ করা বা ইথিরিয়াম ব্লকচেইনে চলবে। এ প্রযুক্তির প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না।
ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে আলোচনার আগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সচরাচর ব্যবহৃত মুদ্রাব্যবস্থা নিয়ে একটু জেনে নেয়া যাকঃ

বহু বছর আগে থেকেই মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী জিনিসপত্র লেনদেন করে আসছে। লেনদেনের সবচেয়ে প্রাচীন এবং অধিক প্রচলিত প্রথার মধ্যে অন্যতম ছিলো বিনিময় প্রথা। কিন্তু মানদন্ডের বিচারে সেখানে বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছেন। ধরা যাক, ফল ব্যবসায়ী শফিক সাহেবের একবস্তা চাল লাগবে এবং বিনিময়ে তাকে এক বস্তা তুলা দিতে হবে। কিন্তু শফিক সাহেবের কাছে কোন তুলা নেই। যেহেতু শফিক সাহেবের কাছে কোন তুলা নেই, তাহলে এখানে বিনিময় কার্য সম্পন্ন হতে পারছেনা।

বিনিময় প্রথার এই সমস্যা থেকে নিস্তার পাওয়ার লক্ষ্যে সবাই এমন একটা প্রথা উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো, যেখানে সব ধরণের পণ্যের একটা আদর্শ মূল্য থাকবে। উদাহরণ হিসেবে গোল্ডের কথা বলা যেতে পারে। অনেক বছর আগে থেকে এখনো গোল্ডকে সম্পদ পরিমাপের একটা একক হিসাবে ধরা হত। আগে সরাসরি গোল্ড লেনদেন হত, সেটা একসময় মানুষের প্রয়োজনমত কাগজের মুদ্রা ব্যাবস্থায় রূপ নেয়।

এভাবে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রা যেমন, টাকা, ডলার, পাউণ্ড, ইউরো ইত্যাদি এসেছে। দেশের অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই মুদ্রা ছেপে বাজারে ছাড়তে পারে মানুষের ব্যবহারের জন্য। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন বা সম্পদ আদান প্রদান সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো দেশের আইন অনুযায়ী সামলানোর জন্য তৈরি হয়েছে ব্যাংক বা ব্যাংকিং সিস্টেম। কিন্তু এতে করেও সমস্যার সমাধান হয়নি। পৃথিবীর ইতিহাসে বড় বড় ব্যাংক ডাকাতির ভয়াবহ গল্পগুলো শুনলে কার না হৃদয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়! তবুও সময় বয়ে যায়, আর মানুষ ও দমে যাবার পাত্র নয়। নিজের প্রয়োজনে তারা আবিষ্কার করে একের পর এক বিস্ময়। আজকে আমরা তেমনি এক বিস্ময়ের কথা বলবো।

বর্তমানে প্রচলিত নানান মূদ্রা
বর্তমানে প্রচলিত নানান মূদ্রা
মূল আলোচনায় যাবার আগে আমরা একটা কাল্পনিক দৃশ্যপট কল্পনা করার চেষ্টা করবো।

খুব ছোটবেলা থেকে আপনার অনেক ধরণের শখ আছে। এর মধ্যে অন্যতম শখ হচ্ছে আর্ট এন্ড কালচার। অর্থাৎ এই আধুনিকায়ন সভ্যতায় বসে আপনার দুষ্প্রাপ্য চিত্রকর্মের প্রতি বিশেষ আগ্রহ আছে। খুব ছোটবেলা থেকে সংগ্রহ করছেন। তাই নিজের এত বছরে সংগ্রহ করা চিত্রকর্ম নিয়ে আপনার ছোটখাটো একটা মিউজিয়াম আছে। কথায় আছে শখের তোলা ৮০, এর জন্য মূল্য ও দিতে হয় অনেক। এসব জিনিস সংগ্রহ করা এবং নিজের সংগ্রহে রাখা দুইটারই ঝামেলা অনেক। কারন এসবের উপর নানা ধরনের লোকজনের নজর থাকে, অনেক সময় এগুলো নিয়ে বড় ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধ কিংবা দুর্ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় শেষের দিকে অথবা চাকরি নিয়ে বেশ ব্যস্ত কিংবা এখন আর আগের মতো পেইন নিতে চান না, আবার শখের জিনিষ ছাড়তে ও চান না। তাই বেশ কিছুদিন ধরে ভাবছেন এমন কোন উপায় নিয়ে যা দিয়ে সংগ্রহের সকল আর্টগুলো এমনভাবে সংরক্ষণ করা যায় যেন,

প্রথমেই পণ্যের গুণগত মান নিশ্চায়ন করা।
আর্থিক লেনদেন এবং আইনগত ব্যাপারগুলো বাড়িতে বসে, বিনা ঝামেলায়, নীরবে এবং স্বল্পতম সময়ে করে ফেলা।
বিক্রয় করার সময় একটি স্বচ্ছ লেনদেন প্রক্রিয়া।
পণ্যের কঠোর নিরাপত্তা।
অর্থাৎ যদি কোন চোর কোনক্রমে আপনার কোন আর্ট চুরি করে বাইরে বিক্রি করতে যায়, তাহলে যেন সে চোরাই জিনিস বিক্রির দায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং চোর যদি পালিয়েও যায়, যে সেটা কিনেছে সে ধরা পড়ে চোরাই জিনিস কেনার অপরাধে।

বিনিময় প্রথা তো আর আপনার এই চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থা চাইলেই আপনার এই সমস্যা দূর করতে পারে। কিন্তু ঐ যে বললাম বড় বড় ব্যাংক ডাকাতির করুণ ইতিহাসের কথা। অন্যদিকে আপনি যে ধরণের আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যাংকগুলো এই মুহূর্তে দিতে পারছে না।

আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি সেই সাপেক্ষে ব্যাংকের ভূমিকা একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করি।

আপাতত আমরা এখানে ব্যাংকের গুরুত্ব বুঝানোর চেষ্টা করি। ধরে নিচ্ছি, আপনি আপনার চিত্রকলা সম্পর্কিত কোন কাজের জন্য মিসরের কোন এক পত্নতাত্ত্বিক ব্যবসায়ীর কাছে টাকা পাঠাবেন। তো আপনি জানেন কিংবা শুনেছেন যে প্রায় সময় তারা টাকা নিয়ে অনেক ধরণের অনৈতিক পথের আশ্রয় নেয়। তাই আপনি তাদের টাকা দিতে ঠিক ভরসা পাচ্ছেন না। যদি টাকা নিয়ে সে ব্যবসায়ী অস্বীকার করে! সুতরাং এক্ষেত্রে আপনার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান লাগবে যেখানে আপনি স্বাচ্ছন্দে টাকা আদান-প্রদান করতে পারবেন। অর্থাৎ আপনার অ্যাকাউন্টের টাকা আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিসরের সেই ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে যাবে, এবং প্রতিষ্ঠানটি সেই লেনদেনের রেকর্ড রাখবে যাতে এই লেনদেন নিয়ে দুইজনের কেউ কোন প্রশ্ন না তুলতে পারে। এই মাঝখানের প্রতিষ্ঠানটি হল ব্যাংক।

কেমন হতো যদি আপনি তৃতীয় কোন পক্ষ কিংবা ব্যাংকের আশ্রয় না নিয়ে কোন উপায়ে মিসরের সেই ব্যবসায়ীকে টাকা দিতে পারতেন? এখানে আমরা মূলত একটি প্রসেস নিয়ে চিন্তা করছি যা একটি ব্যাংকের চাইতে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে কোন অর্থ লেনদেন নিশ্চিত করবে। এমনকি সেই সিস্টেমে থাকবে না হ্যাংকি কিংবা কোন ধরণের লুটপাটের সম্ভাবনা।

আসলে এই প্রযুক্তির নাম হল ব্লকচেইন, যাকে বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তিবিদ ভবিষ্যতের ব্যাংকিং টেকনোলজি হিসাবে দেখছেন এবং কিছু প্রভাবশালী দেশের কয়েকটি ব্যাংক ইতোমধ্যে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এই প্রযুক্তির পেছনে। ব্লকচেইন সিস্টেম এবং সেটার জন্য প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন ডিজাইন ও ডেভেলপ করেন যিনি তার নাম সাতোশি নাকামোতো। 'যিনি' কথাটা এখানে সম্ভবত ঠিক নয়, কেননা সাতোশি নাকামতোর পরিচয় এখনও জানা যায়নি। এটা হতে পারো কোন ব্যাক্তি, গোষ্ঠি, প্রতিষ্ঠার বা কোম্পানির কোডনেম।

এতক্ষণ পর্যন্ত ঠিকই ছিলো। এখন নিশ্চইয় ভাবছেন এই ব্লকচেইন আবার কি! তাহলে চলুন ব্লক চেইন নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

ব্লকচেইন কি?
মোটামুটি নির্দিষ্ট একটি সময়ের মধ্যে সারা পৃথিবী জুড়ে যত অর্থের বা সম্পদের লেনদেন হচ্ছে সেই লেনদেনের সকল এনক্রিপটেড তথ্য একসাথে নিয়ে একটা ব্লক বানানো হয়। সেই ব্লক দিয়ে ক্রমানুসারে সাজানো সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয় একটা ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড লেজারকেই মূলত ব্লকচেইন বলা হয়। কেমন যেন ঘোলাটে লাগছে সব কিছু, তাইনা! বিটকয়েন কে আমরা এখন অনেকেই চিনি। এখানে আমরা যে ব্লক চেইনের কথা বলছি তার একটা উদাহরণ হচ্ছে বিটকয়েন ব্লকচেইন। বিটকয়েন একটা ক্রিপ্টোকারেন্সি যা কোন একটা ব্লকচেইন ব্যবহার করে পরিচালিত হয়।

ব্যাংকের যাবতীয় লেনদেন রেকর্ড করার জন্য সকল শাখায় একটা বড় সাইজের খাতা থাকে। আর যে ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে, তাদের এই রেকর্ড থাকে ডেটাবেইজে। হয়তো, সেই পুরানো খাতাতেও থাকে। এই বড় সাইজের খাতাটাকে বলে লেজার। তো একটা ভ্যালিড ট্রানকেজশানের জন্য অবশ্যই ব্যাংকের লেজারে সেটার এন্ট্রি থাকতে হবে। ব্লকচেইন এরকম একটা লেজার, যেখানে পাশাপাশি একটার পর একটা এরকম অনেকগুলো ব্লক থাকে। প্রত্যেকটা ব্লকের ভিতর থাকে একটা সময়ে মাঝে সারা পৃথিবীতে যত ট্রানজেকশান হয়েছে সেটার সকল ডেটা। এই ডেটা ওপেন কিন্তু এনক্রিপ্টেড অর্থাৎ সবাই দেখতে পারবে এই ডেটা কিন্তু পড়তে গেলে প্রাইভেট কী লাগবে। অর্থাৎ আপনি যদি এখানে ট্রাঞ্জেকশান করে থাকেন তাহলে শুধুমাত্র আপনি এখান থেকে আপনার ট্রানজেকশনের সকল তথ্য সেটার প্রাইভেট কী ব্যাবহার করে পড়তে পারবেন, অন্য কেউই পারবেনা। তবে মানুষ যেটা দেখবে তা হল ট্রানজেকশনের পরিমাণ। তবে কার অর্থ কার কাছে গিয়েছে সেটা এভাবে জানা যাবেনা। কেননা শুধুমাত্র এড্রেস দিয়ে চলে যাবে টাকা। কোন পরিচয় থাকবেনা।

নিচের ছবিতে দেখা যাবে একটা ট্রানজেকশান দেখতে কেমন। ব্লকচেইনের প্রত্যেকটা ব্লক সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয়। একবার চেইনে একটা ব্লক যোগ হয়ে গেলে সেটাতে কোন প্রকারের পরিবর্তন অসম্ভব। ব্লকগুলো পাশাপাশি তাদের সৃষ্টির ক্রমানুসারে বসে। প্রত্যেকটা ব্লক তার আগে কোন ব্লক আছ সেটা জানে। এভাবে একটা ব্লকের সাথে আরেকটা কানেক্টেড। ব্লকচেইন ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড সিস্টেম, অর্থাৎ সারা পৃথিবীতে বলতে গেলে একই ব্লকচেইনের সব ইউজার বা ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষ ইউজারদের কাছে একেবারে কার্বন কপি আছে। কাজেই একটা বা শ-খানেক সার্ভার বা কম্পিউটার একসাথে নস্ট হয়ে গেলেও ব্লকচেইনের কিছুই হবেনা।

ক্রিপটোকারেন্সিঃ
আমাদের প্রচলিত মুদ্রার মত ক্রিপ্টোকারেন্সি ও এক প্রকার মুদ্রা বা বিনিময় মাধ্যম। অর্থাৎ প্রচলিত মুদ্রা যেমন, ডলার, পাউন্ড, টাকা ইত্যাদি দিয়ে যে কাজ করা যায়, ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়েও সেই একই কাজ করা যায়। ব্লকচেইন টেকনোলজির মাধ্যমে লেনদেনের জন্য এই ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করা হয়। এইরকম মুদ্রা অনেক আছে, যেমন বিটকয়েন, বিটক্যাশ, মোনেরো, লাইটকয়েন ইত্যাদি। আমাদের মুদ্রা যেমন, ডলার, পাউণ্ড, টাকা ইত্যাদির দাম বিভিন্ন সময় ওঠানামা করে, এগুলোর ক্ষেত্রেও তাই, অর্থাৎ ক্রয়/বিক্রয় মূল্য ওঠানামা করে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি
ক্রিপ্টোকারেন্সি
তো এতক্ষণে নিশ্চইয় বুঝতে পেরেছেন ক্রিপ্টোকারেন্সি মানে কি। চলুন এবার তাহলে ক্রিপ্টোকারেন্সির কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

ক্রিপ্টোকারেন্সি ( যেমন ধরুন, বিটকয়েন) একটি নেটওয়ার্কের মতো। প্রতিটি পিয়ারের সমস্ত লেনদেনের সম্পূর্ণ ইতিহাস এবং এইভাবে প্রতিটি অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্সের রেকর্ড আছে। যেমন একটি ট্রান্সজেকশন ফাইল বলছে, "শামছুল x পরিমাণ বিটকয়েন অ্যালিস্কে দেয়" এবং এটি শামছুল হকের ব্যাক্তিগর কী দ্বারা সাক্ষরিত। এটি মৌলিক পাবলিক কী ক্রিপ্টোগ্রাফি। স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে একটি লেনদেন পুরো নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি এক পিয়ার থেকে অন্য পিয়ারে পাঠানো হয়। এটি মৌলিক P2P প্রযুক্তি। নিচের ইনফোগ্রাফ থেকে ধারণা পাওয়া যাবে কিভাবে ব্লকচেইন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি কাজ করে। ছবিটিতে ক্লিক করলে বড় আকারে দেখঅ যাবে।

Blockchain Infographic [www.pwc.com]
Blockchain Infographic [www.pwc.com]
লেনদেনটি অতি দ্রুত সম্পন্ন হয়। তবে নির্দিষ্ট সময় পরে নিশ্চিত হয়। অনেকটা কোন একাউন্ট অ্যাকটিভ করার মাধ্যমে কনফার্ম করার মতো। এই কনফার্ম বা নিশ্চিতকরণ ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যতক্ষণ লেনদেন অনিশ্চিত হয় ততক্ষণ, এটি মুলতুবি আছে এবং জাল করা হতে পারে। যখন একটি লেনদেন নিশ্চিত করা হয়, এটি পুরোপুরিভাবে লেজারে সেট করা হয়। এটিকে আর সংশোধন করা যাবেনা, মুছে ফেলা যাবে না। অর্থাৎ লেজারের তথ্য আর আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন না। এই প্রসেসটিই মূলত ব্লকচেইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা আগেই আলোচনা করা হয়েছে।
শুধুমাত্র মাইনাররা ট্রানজেকশন নিশ্চিত করতে পারবেন। মূলত ক্রিপ্টোকারেন্সি নেটওয়ার্কে এটিই মাইনারদের কাজ। তারা ট্রানজেকশন গ্রহন করে, লেজারে জমা রাখার পর নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে দেয়। যখনি মাইনার কর্তৃক ট্রানজেকশন নিশ্চিত করা হয়, তখনি সেটা অপরিবর্তনীয় ব্লকচেইনের অংশ হয়ে যায়। এই কাজের জন্য মাইনাররা ক্রিপ্টোকারেন্সির টোকেন (ফী বলা যায়) লাভ করে (যেমন: বিটকয়েন)। যেহেতু মাইনরদের কার্যকলাপ ক্রিপ্টোকুরেন্স-সিস্টেমের একক সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাই আমরা মাইনরদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবো।

প্রচলিত সকল মুদ্রার নিয়ন্ত্রক হল কোন দেশের সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারি হোক বা আমেরিকার মত প্রাইভেট হোক, দেশের অর্থনীতি এবং আরও অন্যান্য কিছু বিষয় বিবেচনা করে নতুন কারেন্সি তৈরি করতে পারে। সোজা বাংলায় নতুন 'ব্যাংক নোট' ছাপতে দিতে পারে। অর্থাৎ সেটা নিয়ন্ত্রকেরা নিজেদের ইচ্ছামত করতে পারে, কার লাভ কার ক্ষতি সেটা নিয়ে তাদের মাথা না ঘামালেও তাদের চলে অনেকসময়। যেমন, আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টাকা ছাপা হওয়ার কারনে আমাদের মুদ্রাস্ফীতি আছে।

কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে তৈরি হয়। এখানে নতুন কারেন্সি বা বিটকয়েন আসে প্রতি ১০ মিনিটে একটি ক্রিপ্টোগ্রাফিক পাজল সমাধান করার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। আর এই পাজল প্রতিযোগিতাই হয় মাইনারদের মাধ্যমে।

যারা এনক্রিপশান সম্পর্কে জানে, তাদের কাছে SHA256 এনক্রিপশান পরিচিত হওয়ার কথা। যারা পরিচিত না, এটুকু জানলেই হবে, যে কোন ডেটাকে SHA256 এ যদি এনক্রিপ্ট করা হয় তাহলে ওই ডেটার জন্য একটা হ্যাশ পাওয়া যায়। হ্যাশ হল বোঝার সুবিধার্থে, "000001beeca3785d515897041af0a7" এরকম কিছু একটা। এখন এই ডেটা থেকে যদি অতি সামান্য কোন কিছুও পরিবর্তন হয়, তাহলে একটি ভিন্ন হ্যাশ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ এভাবে এনক্রিপ্ট করলে নির্দিষ্ট একটা ডেটার জন্য হ্যাশ সর্বদা একই হবে, এবং সবার কম্পিউটারেই একই হবে।

এখন লক্ষ করি, উপরে যে হ্যাশটা আমি ব্যবহার করেছি ওখানে শুরুতে ৫টা জিরো আছে। এটা ইচ্ছাকৃত। এবং এটাই সেই ক্রিপটোগ্রাফিক পাজল যেটার কথা একটু আগে বলেছি। প্রতি মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে বিটকয়েনের ব্লকচেইনে অসংখ্য লেনদেন চলছে। ব্লকচেইনে নতুন একটা ব্লক যোগ হওয়ার পর থেকে আনুমানিক ১০ মিনিট ধরে পেন্ডিং ট্রানজেকশনের ডেটা বিটকয়েন সিস্টেমের সকল মাইনারদের কম্পিউটারে জমতে থাকে। তো কথা হচ্ছে মাইনার মানে আমরা নিজেরা এবং আমরা কম্পিউটার নিয়ে বসে আছি পাজল সমাধান করার জন্য।

এখন আমাদের বা মাইনারদের টার্গেট হল, যে ডেটা আমাদের কাছে এই মুহূর্তে আছে সেটা, আগের ব্লকের হ্যাশ এবং তার সাথে আরেকটা Random Number (এখানে একে Nonce = Number Used Once বলা হয়) মিলিয়ে উপরের মত শুরুতে ৫টা জিরো আছে এরকম প্যাটার্নের একটা হ্যাশ খুঁজে বের করা। এই ৫টা জিরো কেন? এটাকে বলা হয়, ডিফিকাল্টি লেভেল, অর্থাৎ শুরুতে কয়টা জিরো বসবে সেটা আসলে পাজলটা সমাধান করা কত কঠিন সেটা নির্দেশ করে।

এভাবে মুহূর্তের মধ্যে সারা পৃথিবীতে হাজার হাজার মাইনার তাদের কম্পিউটারে সেই কাঙ্ক্ষিত হ্যাশ খুঁজে বের করার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। এই প্রসেস আসলে কোন বিশেষ অ্যালগরিদম বা বুদ্ধি দিয়ে জেতা যাবেনা। একেবারে বাংলা পদ্ধতিতে একটার পর একটা Nonce বা এক্সপ্রেশন প্রয়োগ করে চেক করতে হবে সেই প্যাটার্নের হ্যাশ পাওয়া গেল কিনা।

এই প্রতিযোগিতায় যে মাইনার সবার আগে এই হ্যাশ খুঁজে বের করতে পারে যে জয়ী। হ্যাশ খুঁজে পাওয়া মানে হল, নতুন একটা ব্লকচেইনের জন্য নতুন একটা ব্লক তৈরি হওয়া। চমৎকার না? বাকি মাইনার যারা জিততে পারলোনা তাদের কাজ হল, বিজয়ী মাইনারের রেজাল্ট সঠিক কিনা সেটা ভেরিফাই করা। এভাবে সম্ভবত ৫১.৭% মাইনার ভেরিফাই করে দিলে তখন, নতুন ব্লকটা একটা পরীক্ষিত বা সঠিক ব্লক হিসাবে ব্লকচেইনে যোগ হয়ে যায়।

বিটকয়েন কিভাবে কাজ করে তার একটা ভিজুয়াল আইডিয়া নিচের ভিডিও থেকে পাওয়া যেতে পারে।


বাংলায় ব্লকচেইন নিয়ে যত লিখা আছে তার মাঝে মিডিয়ামের ব্লকচেইন এ ভবিষ্যৎ! লিখাটি সবচেয়ে বেশি সহজ এবং ভালো বলে মনে হয়েছে আমার। সকল তথ্য খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অবশ্যপাঠ্য!

ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে অনেক আলোচনা করা হলো।ক্রিপ্টোকারেন্সির অনেক ধরণের প্রকারভেদ আছে।যদি বিটকয়েন অধিক ব্যবহৃত ক্রিপ্টোকারেন্সি।এছাড়াও অনেক ধরণের ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে।

অন্যদিকে ক্রিপ্টোকারেন্সির সিকিউরিটি নিয়েও অনেকের সন্দেহ থাকতে পারে। বাকী সব ক্রিপ্টোকারেন্সি, ক্রিপ্টোকারেন্সির নিরাপত্তা এবং ভবিষৎ নিয়ে আগামী পর্বে আলোচনা করা হবে। সবাইকে সেই পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে আজকে এখানেই শেষ করছি।অনলাইনে লেনদেনে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা বিটকয়েন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার হয়ে আসছে বেশ কয়েক বছর থেকে এবং দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই ‘ক্রিপটোকারেন্সি’। বাংলাদেশেও সম্প্রতি এর লেনদেন শুরু হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বিটকয়েনের আইনি কোনো ভিত্তি নেই। আর ঝুঁকি এড়াতে এ দিয়ে লেনদেন কিংবা এর প্রসারে সহায়তা কিংবা প্রচার থেকে বিরত থাকতে সবাইকে অনুরোধ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার প্রচলন করে। এ ধরনের মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি নামে পরিচিতি পায়। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সে ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেওয়া হয় বিটকয়েন।এছাড়াও আছে ইথিরিয়াম, রিপেল, লাইটকয়েন। তবে সবার থেকে জনপ্রিয় বিটকয়েন।
কিন্তু বিটকয়েন কী? আর কীভাবেই বা কাজ করে বিটকয়েন? আসুন তা জেনে নেয়া যাক-

বিটকয়েন কী?
উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, বিটকয়েন হল এক ধরনের ‘মুদ্রা’ যা দিয়ে অনলাইনে লেনদেন করা যায়। এটিকে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ক্রিপটোগ্রাফিক কারেন্সি বলা হয়। মূলত এটি হল ওপেন সোর্স ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রোটকলের মাধ্যমে লেনদেন হওয়া সাংকেতিক মুদ্রা। বিটকয়েনের সবথেকে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এটি লেনদেনের জন্য কোন ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না। আর তাই প্রয়োজন হয় না কোন অনুমোদনেরও। আর ইন্টারনেটে লেনদেনকারীদের নিকট খুবই জনপ্রিয় বিটকয়েন।

ইতিহাস
অস্ট্রেলিয়ার এক কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ী সাতোশি নাকামোতো ২০০৮ সালে এই মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন করেন। তিনি এ মুদ্রা ব্যবস্থাকে পিয়ার-টু-পিয়ার লেনদেন নামে অভিহিত করেন।বিটকয়েনের লেনদেনটি বিটকয়েন মাইনার নামে একটি সার্ভার কর্তৃক সুরক্ষিত থাকে। পিয়ার-টু-পিয়ার যোগাযোগ ব্যাবস্থায় যুক্ত থাকা একাধিক কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মধ্যে বিটকয়েন লেনদেন হলে এর কেন্দ্রীয় সার্ভার ব্যবহারকারীর লেজার হালনাগাদ করে দেয়। একটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে নতুন বিটকয়েন উৎপন্ন হয়। ২১৪০ সাল পর্যন্ত নতুন সৃষ্ট বিটকয়েনগুলো প্রত্যেক চার বছর পরপর অর্ধেকে নেমে আসবে। ২১৪০ সালের পর ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন তৈরী হয়ে গেলে আর কোন নতুন বিটকয়েন তৈরী করা হবে।

কার্যপ্রণালী
বিটকয়েনের লেনদেন হয় পিয়ার টু পিয়ার বা গ্রাহক থেকে গ্রাহকের কম্পিউটারে। আগেই বলা হয়েছে এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান নেই। বিটকয়েনের সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অনলাইনে একটি উন্মুক্ত সোর্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে। বিটকয়েন মাইনারের মাধ্যমে যেকেউ বিটকয়েন উৎপন্ন করতে পারে। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় অনুমানযোগ্য এবং সীমিত। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার সাথে সাথে এটি গ্রাহকের ডিজিটাল ওয়ালেটে সংরক্ষিত থাকে। এই সংরক্ষিত বিটকয়েন যদি গ্রাহক কর্তৃক অন্য কারও একাউন্টে পাঠানো হয় তাহলে এই লেনদেনের জন্য একটি স্বতন্ত্র ইলেক্ট্রনিক সিগনেচার তৈরী হয়ে যায় যা অন্যান্য মাইনার কর্তৃক নিরীক্ষিত হয় এবং নেটওয়ার্কের মধ্যে গোপন অথচ সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত হয়। একই সাথে গ্রাহকদের বর্তমান লেজার কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে হালনাগাদ হয়। বিটকয়েন দিয়ে কোন পণ্য কেনা হলে তা বিক্রেতার একাউন্টে পাঠানো হয় এবং বিক্রেতা পরবর্তীতে সেই বিটকয়েন দিয়ে পুনরায় পণ্য কিনতে পারে, অপরদিকে সমান পরিমাণ বিটকয়েন ক্রেতার লেজার থেকে কমিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যেক চার বছর পর পর বিটকয়েনের মোট সংখ্যা পুনঃনির্ধারন করা হয় যাতে করে বাস্তব মুদ্রার সাথে সামঞ্জস্য রাখা যায়।

সুবিধা-অসুবিধা
অনলাইনে যারা লেনদেন করেন তাদের জন্য খুবই সুবিধাজনক বিটকয়েন। যাদের বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন করার মত সুযোগ নেই বা ক্রেডিট কার্ড নেই তাদের জন্যও ব্যাপক উপকারি এ বিটকয়েন। তবে কোন ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান না থাকা এবং এর কার্যক্রম তদারকি করার কোন সুযোগ না থাকায় অপরাধীদের কাছেও খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিটকয়েন। বৈধ লেনদেনের পাশাপাশি অবৈধ লেনদেনেও ব্যবহৃত হয় বিটকয়েন। জুয়া খেলা বা বাজি ধরা, অবৈধ পণ্য কেনা-বেচা ইত্যাদির লেনদেনে ব্যবহৃত হয় বিটকয়েন।মাদক চোরাচালান এবং অর্থপাচার কাজেও বিটকয়েনের ব্যবহার আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আলোচনা-সমালোচনা
সম্প্রতি কানাডার ভ্যানক্যুভারে বিটকয়েন এর প্রথম এটিএম মেশিন চালু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এটি বিটকয়েনকে আরও আগিয়ে নিয়ে যাবে। মাদক, চোরাচালান অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা ও অন্যান্য বেআইনি ব্যবহার ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডীয় সরকার বিটকয়েনের গ্রাহকদের নিবন্ধনের আওতায় আনার চিন্তাভাবনা করছে। অন্যদিকে অনেক দেশই অবস্থান নিচ্ছে বিটকয়েনের বিরুদ্ধে। দিও বিটকয়েন ডিজিটাল কারেন্সি হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিপরীতে এর দর মারাত্মক ওঠানামা, দুষ্প্রাপ্যতা এবং ব্যবসায় এর সীমিত ব্যবহারের কারণে অনেকেই এর সমালোচনা করেন।এখন যুগ ভার্চুয়াল মুদ্রা বা বিটকয়েনের। কিন্তু কি এই ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল মুদ্রা? ডিজিটাল মুদ্রার আদান-প্রদান হয় অনলাইনে। বিনিময়ের সব তথ্য গোপন থাকে, বেশির ভাগ সময়েই থাকে অজ্ঞাত। ধরুন, আপনার অর্থ আছে, কিন্তু পকেটে নেই। ব্যাংকে বা সিন্দুকেও সেই অর্থ রাখা হয়নি। রাখা হয়েছে ইন্টারনেটে। কোনো দিন ছুঁয়েও দেখতে পারবেন না অনলাইনে রাখা ওই অর্থ। শুধু ভার্চ্যুয়াল জগতের এ মুদ্রাকেই বলা হয় ডিজিটাল মুদ্রা বা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা।

ডিজিটাল মুদ্রার আদান-প্রদান হয় অনলাইনে। বিনিময়ের সব তথ্য গোপন থাকে, বেশির ভাগ সময়েই থাকে অজ্ঞাত। এ ধরনের ডিজিটাল মুদ্রাকে বলা হয় ক্রিপ্টোকারেন্সি। এ ধরনের মুদ্রার বিনিময়ে ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি নামের একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে প্রচলিত ভাষা বা সংকেতে লেখা তথ্য এমন একটি কোডে লেখা হয়, যা ভেঙে তথ্যের নাগাল পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতিতে ব্যবহারকারী ছাড়া অন্য কারও কোনো কেনাকাটা বা তহবিল স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া বেশ কঠিন।

এরপরও ডিজিটাল মুদ্রার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা ঘটে গেছে গত শুক্রবার। টোকিওভিত্তিক ডিজিটাল মুদ্রার বিনিময় প্রতিষ্ঠান কয়েনচেকের কম্পিউটার ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক হ্যাক করে মোট ৫৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার মূল্যমানের ডিজিটাল মুদ্রা খোয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২ লাখ ৬০ হাজার গ্রাহক। তবে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের খোয়া যাওয়া অর্থের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার আশ্বাস জানিয়েছে কয়েনচেক। হ্যাকিংয়ে অর্থ চুরির ঘটনায় নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা নিয়ে তোপের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোপনে ও নিরাপদে যোগাযোগের জন্য ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছিল। গাণিতিক তত্ত্ব ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিপ্টোগ্রাফিরও উন্নতি হয়েছে। এতে অনলাইনে ডিজিটাল মুদ্রা সংরক্ষণ ও আদান-প্রদানের বিষয়টি আরও নিরাপদ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

অবশ্য এত নিরাপত্তা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে ডিজিটাল মুদ্রার বিভিন্ন বিনিময় প্রতিষ্ঠানে বেশ কটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল মুদ্রা হিসেবে বিটকয়েনের আবির্ভাব ঘটে। বর্তমানে ইন্টারনেটে এক হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে। কয়েনচেক থেকে চুরি হয়েছে স্বল্প পরিচিত মুদ্রা এনইএম। গত বছরের ডিসেম্বরে নাইসহ্যাশ নামের স্লোভেনিয়ার একটি কোম্পানির মাত কোটি ডলারের বিটকয়েন চুরি হয়। বিটকয়েন চুরির ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালেও। এরও আগে ২০১৪ সালে মুদ্রা চুরির শিকার হয়েছিল আরেক বিনিময় প্রতিষ্ঠান এমটিগক্স। তাদের নেটওয়ার্ক থেকে ৪০ কোটি ডলার চুরি গিয়েছিল। চুরির ঘটনা স্বীকার করার পর ওই প্রতিষ্ঠান শেষে বন্ধই হয়ে যায়।

ডিজিটাল মুদ্রা কোনগুলো?
বিশ্বে এখন হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু আছে। তবে বিনিময় মূল্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে নিচের ডিজিটাল মুদ্রাগুলো:

বিটকয়েন: এখন পর্যন্ত চালু থাকা ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিটকয়েন। এর বিনিময় মূল্যও সবচেয়ে বেশি। সাতোশি নাকামোতো ২০০৯ সালে বিটকয়েন তৈরি করেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বিটকয়েনের বাজার পুঁজির পরিমাণ ছিলে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার। কিছুদিন আগে একটি বিটকয়েনের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২০ হাজার ডলার। তবে চলতি বছরে বিনিময় মূল্যের এই হার প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায়।

এথেরিয়াম: ২০১৫ সালে তৈরি হয় এথেরিয়াম। বিটকয়েনের মতো এই মুদ্রারও নিজস্ব হিসাবব্যবস্থা আছে। বিনিময় মূল্যের দিক থেকে এটি দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে বিটকয়েনের পরই আছে এথেরিয়াম। গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার বাজারে পুঁজির পরিমাণ প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০১৬ সালে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর এটি দুটি মুদ্রায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এর বিনিময় মূল্য ৮৪০ ডলারে পৌঁছেছিল। তবে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর প্রতিটি এথেরিয়াম মুদ্রা ১০ সেন্টে বিক্রির ঘটনাও ঘটেছিল।

রিপল: ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রিপল। শুধু ক্রিপ্টোকারেন্সি নয়, অন্যান্য ধরনের লেনদেনও করা যায় এই ব্যবস্থায়। প্রচলিত ধারার বিভিন্ন ব্যাংকও এই ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করছে। বাজারে ১০ বিলিয়ন ডলারের পুঁজি আছে রিপলের।

লাইটকয়েন: বিটকয়েনের সঙ্গে বেজায় মিল আছে লাইটকয়েনের। তবে বিটকয়েনের চেয়ে দ্রুত লেনদেন করা যায় লাইটকয়েনে। এর বাজার মূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার।

‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা-পদ্ধতিতে প্রতিটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্লকচেইন’ নামের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। ছবি: রয়টার্স
‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা-পদ্ধতিতে প্রতিটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্লকচেইন’ নামের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। ছবি: রয়টার্স

কীভাবে কাজ করে ডিজিটাল মুদ্রা?
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিপ্টোকারেন্সি একধরনের বিকেন্দ্রীকৃত প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইনে নিরাপদে অর্থ পরিশোধ করা যায়। আমানতকারীর নাম গোপন রেখে এবং ব্যাংকে না গিয়েই অর্থ জমা রাখা যায়।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থার মতো সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল মুদ্রা ছাপায় না। ‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা পদ্ধতিতে একেকটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত এক বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘ব্লকচেইন’। এই ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ লেনদেনসহ বন্ড, স্টক ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদের কেনাকাটাও করা যায়।

ব্যবহারকারীরা অনলাইনে ব্রোকারদের কাছ থেকেও বিভিন্ন ডিজিটাল মুদ্রা কিনতে পারেন। অনলাইনে ‘ক্রিপ্টোগ্রাফিক ওয়ালেট’ নামক নিরাপদ স্থানে রাখা যায় এই মুদ্রা।

নির্দিষ্ট ডিজিটাল মুদ্রা যত বেশি মানুষ কেনে, সেই মুদ্রার বাজার দর তত বাড়ে। এভাবেই শেয়ার বাজারের মতো নিয়মিত ওঠানামা করে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময় মূল্য। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবহারকারী পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন থাকে বলে অনেক সময় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার বেশি দেখা যায়।

বিশ্বে এখন হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু রয়েছে। তবে বিনিময় মূল্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বিটকয়েন।

কেন ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোকারেন্সি?
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচয় গোপন ও লেনদেন ব্যবস্থায় কঠোর নিরাপত্তা—এই দুটি বিষয়ই হলো ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রাব্যবস্থায় আকৃষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ। এই ব্যবস্থায় একবার লেনদেন হওয়ার পর তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। একই সঙ্গে লেনদেনের খরচ কম হওয়ায় এটি গ্রাহকদের কাছে বেশি নির্ভরযোগ্যতা অর্জন করেছে। এর প্রযুক্তিব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকৃত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, সবার হাতের কাছেই থাকে ডিজিটাল মুদ্রা। যেখানে প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থায় ব্যাংক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্ট না খুললে সেবা পান না কোনো গ্রাহক।

ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে আকৃষ্ট হওয়ার আরেকটি কারণ হলো এতে কম বিনিয়োগ করেই ব্যাপক লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ, প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থার তুলনায় ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর বিনিময় মূল্যের ওঠা-নামা বেশি। তাই রাতারাতি ধনী হওয়ার সুযোগও থাকে। ঠিক এই কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিটকয়েন বা অন্যান্য শীর্ষ ডিজিটাল মুদ্রায় বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে।

তবে এর কিন্তু উল্টো দিকও আছে। অর্থাৎ দর বেড়ে গেলে যেমন ধনী হওয়ার সুযোগ আছে, তেমনি হুট করে দর নেমে গেলে রাস্তাতেও নামতে পারেন। আবার কঠোর গোপনীয়তা থাকায় অবৈধ কর্মকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট লেনদেনে পছন্দের শীর্ষে আছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। তাই বিনিয়োগকারীদের এসব বিষয়ে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে।বর্তমানে ফেসবুক কিংবা ইউটিউবের কল্যাণে আমাদের সবাই হয়তো কখনো না কখনো বিটকয়েন শব্দটি শুনেছি। কিন্তু বিটকয়েন সম্পর্কে বিস্তারিত আমরা অনেকেই ভালোভাবে জানি না। বিটকয়েন কী? কীভাবে কাজ করে? কী কী কাজে ব্যবহার করা হয়? চলুন জেনে নেয়া যাক এসব প্রশ্নের উত্তর।

বিটকয়েন কী?
বিটকয়েন হলো একধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি। আর ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো এমন একধরনের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থা যার কোনো ফিজিক্যাল বা বাস্তব রূপ নেই। বিটকয়েন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি।



বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো বিটকয়েন; Source: crypto-news.net

সাধারণত আমরা টাকা-পয়সা লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি তৃতীয় পক্ষীয় সংস্থার আশ্রয় নেই। যেমন মনে করুন, আপনি আপনার বন্ধুকে কিছু টাকা পাঠাবেন। এক্ষেত্রে আপনি আপনার ফোনের বিকাশ/রকেট একাউন্ট থেকে আপনার বন্ধুকে টাকাটি পাঠিয়ে দিলেন। এখানে আপনি প্রেরক, আপনার বন্ধু প্রাপক এবং বিকাশ/রকেট তৃতীয় পক্ষ, যে কিনা সমস্ত লেনদেন প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করলো এবং এর জন্য কিছু চার্জ আদায় করলো।

কিন্তু বিটকয়েন এমন একটি মুদ্রা ব্যবস্থা যাতে অর্থ আদান-প্রদানের জন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হয় না। প্রেরকের কাছ থেকে সরাসরি বিটকয়েন প্রাপকের কাছে পৌছে যায়। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘পিয়ার টু পিয়ার’ (peer-to-peer)। এক্ষেত্রে সমস্ত লেনদেন প্রক্রিয়াটি হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করে যা অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি প্রক্রিয়া। যেহেতু কোনো তৃতীয় পক্ষীয় সংস্থা এই লেনদেন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে না, সেহেতু বিটকয়েনের লেনদেনের গতিবিধি নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। অর্থাৎ কে কাকে বিটকয়েন পাঠাচ্ছে তার পরিচয় কেউ জানতে পারে না। পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখেই বিটকয়েন লেনদেন করা যায়।

যেভাবে এলো এই বিটকয়েন
২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট। এই দিনে ইন্টারনেট জগতে ‘bitcoin.com’ নামের একটি ওয়েবসাইটের ডোমেইন রেজিস্টার করা হয়। এ বছরেরই নভেম্বর মাসে ‘সাতোশি নাকামোতো’ ছদ্মনামে এক ব্যক্তি বা একটি দল ‘Bitcoin: A Peer-to-Peer Electronic Cash System’ নামে একটি গবেষণাপত্র অনলাইনে প্রকাশ করেন। এই গবেষণাপত্রটিতেই সর্বপ্রথম বিটকয়েন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে সাতোশি নাকামোতো বিটকয়েন তৈরি করার সফটওয়্যারের কোড অনলাইনে রিলিজ করেন। তৈরি হয় বিটকয়েন ‘মাইনিং’ এর সফটওয়্যার। বিটকয়েন মাইনিং হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বিটকয়েন তৈরি করা হয়। ২০০৯ সালের এই জানুয়ারি মাসেই সাতোশি বিশ্বের প্রথম বিটকয়েন তৈরি করেন।


কে এই সাতোশি নাকামোতো তা কেউ জানে না; Source: coindesk.com

বহু বার বহুজনকে সাতোশি নাকামোতো সন্দেহে গ্রেফতার করা হলেও প্রকৃত সাতোশি নাকামোতো কে, বা এই নামের পেছনে কে বা কারা আছে তা আজও জানা যায়নি।

যেভাবে কাজ করে বিটকয়েন
সাধারণ মুদ্রার মতো বিটকয়েন আপনি হাতে নিয়ে লেনদেন করতে পারবেন না। কোনো ব্যাংক কিংবা প্রতিষ্ঠান এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার কারণে বিটকয়েন প্রেরক থেকে সরাসরি প্রাপকের ‘ওয়ালেটে’ চলে যায়। ওয়ালেট হচ্ছে আপনার মানিব্যাগের মতো, যেখানে আপনার নিজের বিটকয়েন জমা থাকে। ওয়ালেট অনলাইন কিংবা অফলাইন দু’ধরনেরই হয়। অনলাইন ওয়ালেট ব্যবহারকারী তার স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটারের মাধ্যমে ব্যবহার করতে পারে।


স্মার্টফোনের মাধ্যমেই ব্যবহার করা যায় ডিজিটাল ওয়ালেট; Source: letstalkpayments.com

প্রতিটি ওয়ালেটের একটি নির্দিষ্ট এড্রেস বা ঠিকানা থাকে। ঠিকানাটি সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড হয় বলে এটি মনে রাখা অসম্ভব। বিটকয়েন লেনদেনের জন্য ব্যবহারকারী তার এই ঠিকানাটি ব্যবহার করে থাকেন।


ব্লকচেইনে জমা থাকে সব লেনদেনের হিসাব; Source: idmmag.com

এক এড্রেস থেকে অন্য এড্রেসে বিটকয়েন পাঠালে তা সাথে সাথে একটি উন্মুক্ত খতিয়ানে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়, যার নাম ‘ব্লকচেইন’। এটি এমনই বিশাল একটি খতিয়ান ব্যবস্থা যাতে এযাবতকালে যত বিটকয়েন লেনদেন হয়েছে তার সবগুলোরই রেকর্ড রয়েছে। প্রতিটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে নেটওয়ার্কে একটি নতুন বিট কয়েন তৈরি হয়। পদ্ধতিকেই বলা হয় বিটকয়েন মাইনিং।

যেভাবে করা হয় বিটকয়েন মাইনিং
বিটকয়েন মাইনিং একটি জটিল প্রক্রিয়া। একটি নির্দিষ্ট মাইনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হয়। এজন্য প্রয়োজন হয় উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কম্পিউটার। কম্পিউটারের সিপিইউ এবং জিপিইউ ব্যবহার করে জটিল কিছু গাণিতিক এলগরিদমের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।


একটি বিটকয়েন মাইনিং রিগ; Source: youtube.com

প্রতিটি বিটকয়েন লেনদেন করা হলে তা ব্লকচেইনে লিপিবদ্ধ হয়। এ সময় বিটকয়েন মাইনাররা মাইনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের বৈধতা নির্ণয় করেন। আর এ সময়ই একটি নতুন বিটকয়েন তৈরি হয়।

বিটকয়েন লেনদেন ও নতুন বিটকয়েন তৈরির এই সমস্ত প্রক্রিয়াটিই ঘটে অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে। ফলে এতে কোনো ধরনের ছলচাতুরী কিংবা প্রতারণার সম্ভবনা থাকে না। উভয় পক্ষেরই পরিচয় থাকে গোপন।

বিটকয়েনের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য
বিটকয়েন একটি সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীভূত মুদ্রা ব্যবস্থা। সরকার কিংবা কোনো কর্তৃপক্ষ এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার ফলে এখানে প্রত্যেক ব্যবহারকারী তাদের বিটকয়েনের প্রকৃত মালিক। অন্য কেউ তাদের বিটকয়েন নেটওয়ার্কের মালিকানা নিতে পারে না।
বিটকয়েন লেনদেনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিই হয় নাম বিহীনভাবে। একজন বিটকয়েন ব্যবহারকারী একাধিক বিটকয়েন একাউন্ট খুলতে পারে। এসব একাউন্ট খোলার জন্য কোনো ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন ব্যবহারকারীর নাম, ঠিকানা ইত্যাদি প্রয়োজন হয় না। ফলে ব্যবহারকারীর প্রকৃত পরিচয় থাকে গোপন।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে। প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড ব্লকচেইনে জমা থাকে যা যে কেউ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে যখন তখন দেখতে সক্ষম। ফলে এখানে কোনো দুর্নীতির সুযোগ নেই।
বিটকয়েন একাউন্ট খোলা খুবই সহজ। এক্ষেত্রে সাধারণ ব্যাংক একাউন্ট খোলার মতো কোনো ঝামেলাযুক্ত ফর্ম পূরণ করতে হয় না। কোন এক্সট্রা ফি-ও প্রয়োজন হয় না। কোনো কাগজপত্রও জমা দেওয়া লাগে না।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া খুবই দ্রুত। পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই বিটকয়েন পাঠানো হোক না কেন তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাপকের কাছে পৌঁছে যাবে।
বিটকয়েনের কিছু অসুবিধা
বিটকয়েন সম্পূর্ণ অফেরতযোগ্য। অর্থাৎ কেউ ভুল করে কোনো ভুল ঠিকানায় বিটকয়েন পাঠিয়ে দিলে তা আর ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে না। প্রেরক-প্রাপক উভয়ের পরিচয়ই সম্পূর্ণ গোপন থাকে। ফলে অনেক অপরাধমূলক কাজে বিটকয়েন ব্যবহার করা সম্ভব। অবৈধ পণ্যের কেনা বেচাতেও বিটকয়েন ব্যবহৃত হয়। ইন্টারনেটের গোপন অংশ ডার্ক ওয়েবের সমস্ত লেনদেন হয় বিটকয়েনের মাধ্যমে।
বিটকয়েনের মূল্য অনেকটাই অস্থিতিশীল। কখনো বিশাল পরিমাণে বাড়ে তো কখনো বিশাল ধস নামে।
বর্তমান বিশ্বে বিটকয়েনের মূল্য ও বাংলাদেশে এর অবস্থা
বিটকয়েন প্রথম চালু হওয়ার পর থেকে দিন দিন এর মূল্য বেড়েই চলেছে। ২০১১ সালে বিটকয়েনের বাজারমূল্য সর্বপ্রথম ০.৩০ ডলার থেকে ৩২ ডলারে উঠে। এরপর ২০১৩ সালে এর দাম উঠে যায় ২৬৬ ডলারে। এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বিটকয়েনের দাম। ২০১৬ সালের শেষের দিকে এই দাম চলে আসে ৬০০ ডলারের উপরে। এরপর ২০১৭ সালে বিটকয়েনের দাম বেড়ে যায় রেকর্ড পরিমাণ। প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার করে বাড়তে বাড়তে এ বছরের নভেম্বরে বিটকয়েনের দাম উঠে যায় ৯,০০০ ডলারের কাছাকাছি। আর এই ডিসেম্বর মাসেই এই দাম বেড়ে পরিণত হয় ১৫,০০০ ডলারেরও বেশিতে যা সত্যিই অভূতপূর্ব একটি ঘটনা।


বিটকয়েনের দাম বেড়েছে ব্যাপক হারে; Source: coindesk.com

বিশ্বের বহু দেশে বিটকয়েন অনেক জনপ্রিয়। ওয়ার্ডপ্রেস, মাইক্রোসফট, উইকিপিডিয়া, ওভারস্টকের মতো বিশ্বের প্রায় ত্রিশ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান বিটকয়েন গ্রহণ করে। দিন দিন এর জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বাড়ছে। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস পর্যন্ত বিটকয়েন নিয়ে মন্তব্য করছেন, “Bitcoin is better than currency“।

এখন চলুন দেখি বাংলাদেশে বিটকয়েনের অবস্থান নিয়ে। বাংলাদেশ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসাবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনে অন্তর্ভুক্ত হয় ২০১৪ সালের ১৫ আগস্টে। কিন্তু বিটকয়েন ফাউন্ডেশনে যুক্ত হওয়ার ঠিক এক মাসের মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় বিটকয়েনের সকল লেনদেনের উপর। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দেশে বিটকয়েনের সকল প্রকার লেনদেন থেকে জনগণকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানায়। অর্থাৎ বিটকয়েন লেনদেনকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশে বিটকয়েনের উপর এই নিষেধাজ্ঞা বজায় রয়েছে।ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ (bitcoin) এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। গত ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনের সদস্যপদ পেয়েছে।

ঢাকা: ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ (bitcoin) এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। গত ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনের সদস্যপদ পেয়েছে। কিন্তু বিটকয়েন কি, কিসের জন্য? কি কাজে প্রয়োজন? এরকম নানাবিধ প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে বাংলানিউজ তার পাঠকদের জন্য নিয়ে এসেছে বিটকয়েন-এর উপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন। প্রথম পর্বে থাকছে ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ পরিচিতি।

সাধারণত কাগজের তৈরি প্রচলিত মুদ্রা বা এ সংশ্লিষ্ট কোন ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্বলিত বস্তু ব্যবহার করে বাস্তব জীবনে এবং অনলাইনে লেনদেন সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো আপাতঃ দৃষ্টিতে কোন প্রকারের সমস্যা ছাড়াই মিটিয়ে ফেলা যায়। তবে বর্তমানে ব্যবহৃত এটিএম কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড অথবা অন্য ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্বলিত বস্তুগুলো ব্যবহারে দুটি বড় সমস্যা রয়েছে।

এসবে লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহক ও গ্রহিতা উভয়কে তৃতীয় কোন পক্ষের উপর ‘ট্রাস্ট’ বা আস্থা রাখতে হয়, উদাহরণস্বরূপ ব্যাংক। তৃতীয় পক্ষ এই ব্যাংকে উভয় পক্ষ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের মুদ্রা পরিশোধ করে, যেটিকে ইংরেজীতে বলে ‘ডাবল স্পেন্ডিং’।ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা ইথিরিয়াম জনপ্রিয় হচ্ছে। বিটকয়েনের পরেই রয়েছে এ মুদ্রা। বিটকয়েনের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই? প্রযুক্তি দুনিয়ায় হইচই তোলা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা বিটকয়েন। অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার প্রচলন করে। এ ধরনের মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি নামে পরিচিতি পায়। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সে ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেওয়া হয় বিটকয়েন।

ক্রিপ্টোকারেন্সির দুনিয়ায় বাজার দখলের দিক থেকে বিটকয়েনের পরের অবস্থানে আছে ইথিরিয়াম। ২০১৩ সালে ভিটালিক বুটকারিন প্রতিষ্ঠিত এ ভার্চ্যুয়াল মুদ্রায় ইথার নামের একটি ক্রিপটোকারেন্সি ব্যবহৃত হয়। অর্থ পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে ও মুদ্রা ব্যবহৃত হয়।

ইথিরিয়াম কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। এ মুদ্রা দিয়ে বিনিয়োগ, বিভিন্ন চুক্তিসহ নানা কাজ করা হয়। ইথিরিয়াম সাধারণত ‘স্মার্ট কনট্রাক্টসে’ ব্যবহৃত হয়। এ স্মার্ট কনট্রাক্টস হচ্ছে লেনদেনের প্রোটোকল বা প্রোগ্রাম যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই চুক্তির শর্ত পূরণ করে।

২০১৬ সাল থেকে এ মুদ্রা দিয়ে লেনদেন হয় এবং বর্তমানে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা জগতে ২৭ শতাংশ দখল করে রেখেছে। ডয়চে ব্যাংক ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের এক প্রতিবেদনে অনুযায়ী, প্রতি বছর এক কোটি ৮০ লাখ ইথারের বেশি অনুমোদন করা হয় না। ইথারের অনুমোদন সীমিত হওয়ায় প্রতিবছর এর চাহিদা বাড়ছে এবং আপেক্ষিক মুদ্রাস্ফীতি হার কম থাকে। এটি মূলত ইথহ্যাস মাইনিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে।

দ্য বিটকয়েন বিগ ব্যাং নামের বইয়ের লেখক ব্রায়ান কেলি লিখেছেন, ইথিরিয়ামের লক্ষ্য হচ্ছে কোনো ডেভেলপারের জন্য স্মার্ট কন্ট্রাক্ট লেখা সহজ করা বা ইথিরিয়াম ব্লকচেইনে চলবে। এ প্রযুক্তির প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না।ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে আলোচনার আগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সচরাচর ব্যবহৃত মুদ্রাব্যবস্থা নিয়ে একটু জেনে নেয়া যাকঃ

বহু বছর আগে থেকেই মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী জিনিসপত্র লেনদেন করে আসছে। লেনদেনের সবচেয়ে প্রাচীন এবং অধিক প্রচলিত প্রথার মধ্যে অন্যতম ছিলো বিনিময় প্রথা। কিন্তু মানদন্ডের বিচারে সেখানে বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছেন। ধরা যাক, ফল ব্যবসায়ী শফিক সাহেবের একবস্তা চাল লাগবে এবং বিনিময়ে তাকে এক বস্তা তুলা দিতে হবে। কিন্তু শফিক সাহেবের কাছে কোন তুলা নেই। যেহেতু শফিক সাহেবের কাছে কোন তুলা নেই, তাহলে এখানে বিনিময় কার্য সম্পন্ন হতে পারছেনা।

বিনিময় প্রথার এই সমস্যা থেকে নিস্তার পাওয়ার লক্ষ্যে সবাই এমন একটা প্রথা উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো, যেখানে সব ধরণের পণ্যের একটা আদর্শ মূল্য থাকবে। উদাহরণ হিসেবে গোল্ডের কথা বলা যেতে পারে। অনেক বছর আগে থেকে এখনো গোল্ডকে সম্পদ পরিমাপের একটা একক হিসাবে ধরা হত। আগে সরাসরি গোল্ড লেনদেন হত, সেটা একসময় মানুষের প্রয়োজনমত কাগজের মুদ্রা ব্যাবস্থায় রূপ নেয়।

এভাবে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রা যেমন, টাকা, ডলার, পাউণ্ড, ইউরো ইত্যাদি এসেছে। দেশের অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই মুদ্রা ছেপে বাজারে ছাড়তে পারে মানুষের ব্যবহারের জন্য। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন বা সম্পদ আদান প্রদান সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো দেশের আইন অনুযায়ী সামলানোর জন্য তৈরি হয়েছে ব্যাংক বা ব্যাংকিং সিস্টেম। কিন্তু এতে করেও সমস্যার সমাধান হয়নি। পৃথিবীর ইতিহাসে বড় বড় ব্যাংক ডাকাতির ভয়াবহ গল্পগুলো শুনলে কার না হৃদয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়! তবুও সময় বয়ে যায়, আর মানুষ ও দমে যাবার পাত্র নয়। নিজের প্রয়োজনে তারা আবিষ্কার করে একের পর এক বিস্ময়। আজকে আমরা তেমনি এক বিস্ময়ের কথা বলবো।

বর্তমানে প্রচলিত নানান মূদ্রা
বর্তমানে প্রচলিত নানান মূদ্রা
মূল আলোচনায় যাবার আগে আমরা একটা কাল্পনিক দৃশ্যপট কল্পনা করার চেষ্টা করবো।

খুব ছোটবেলা থেকে আপনার অনেক ধরণের শখ আছে। এর মধ্যে অন্যতম শখ হচ্ছে আর্ট এন্ড কালচার। অর্থাৎ এই আধুনিকায়ন সভ্যতায় বসে আপনার দুষ্প্রাপ্য চিত্রকর্মের প্রতি বিশেষ আগ্রহ আছে। খুব ছোটবেলা থেকে সংগ্রহ করছেন। তাই নিজের এত বছরে সংগ্রহ করা চিত্রকর্ম নিয়ে আপনার ছোটখাটো একটা মিউজিয়াম আছে। কথায় আছে শখের তোলা ৮০, এর জন্য মূল্য ও দিতে হয় অনেক। এসব জিনিস সংগ্রহ করা এবং নিজের সংগ্রহে রাখা দুইটারই ঝামেলা অনেক। কারন এসবের উপর নানা ধরনের লোকজনের নজর থাকে, অনেক সময় এগুলো নিয়ে বড় ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধ কিংবা দুর্ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় শেষের দিকে অথবা চাকরি নিয়ে বেশ ব্যস্ত কিংবা এখন আর আগের মতো পেইন নিতে চান না, আবার শখের জিনিষ ছাড়তে ও চান না। তাই বেশ কিছুদিন ধরে ভাবছেন এমন কোন উপায় নিয়ে যা দিয়ে সংগ্রহের সকল আর্টগুলো এমনভাবে সংরক্ষণ করা যায় যেন,

প্রথমেই পণ্যের গুণগত মান নিশ্চায়ন করা।
আর্থিক লেনদেন এবং আইনগত ব্যাপারগুলো বাড়িতে বসে, বিনা ঝামেলায়, নীরবে এবং স্বল্পতম সময়ে করে ফেলা।
বিক্রয় করার সময় একটি স্বচ্ছ লেনদেন প্রক্রিয়া।
পণ্যের কঠোর নিরাপত্তা।
অর্থাৎ যদি কোন চোর কোনক্রমে আপনার কোন আর্ট চুরি করে বাইরে বিক্রি করতে যায়, তাহলে যেন সে চোরাই জিনিস বিক্রির দায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং চোর যদি পালিয়েও যায়, যে সেটা কিনেছে সে ধরা পড়ে চোরাই জিনিস কেনার অপরাধে।

বিনিময় প্রথা তো আর আপনার এই চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থা চাইলেই আপনার এই সমস্যা দূর করতে পারে। কিন্তু ঐ যে বললাম বড় বড় ব্যাংক ডাকাতির করুণ ইতিহাসের কথা। অন্যদিকে আপনি যে ধরণের আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যাংকগুলো এই মুহূর্তে দিতে পারছে না।

আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি সেই সাপেক্ষে ব্যাংকের ভূমিকা একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করি।

আপাতত আমরা এখানে ব্যাংকের গুরুত্ব বুঝানোর চেষ্টা করি। ধরে নিচ্ছি, আপনি আপনার চিত্রকলা সম্পর্কিত কোন কাজের জন্য মিসরের কোন এক পত্নতাত্ত্বিক ব্যবসায়ীর কাছে টাকা পাঠাবেন। তো আপনি জানেন কিংবা শুনেছেন যে প্রায় সময় তারা টাকা নিয়ে অনেক ধরণের অনৈতিক পথের আশ্রয় নেয়। তাই আপনি তাদের টাকা দিতে ঠিক ভরসা পাচ্ছেন না। যদি টাকা নিয়ে সে ব্যবসায়ী অস্বীকার করে! সুতরাং এক্ষেত্রে আপনার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান লাগবে যেখানে আপনি স্বাচ্ছন্দে টাকা আদান-প্রদান করতে পারবেন। অর্থাৎ আপনার অ্যাকাউন্টের টাকা আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিসরের সেই ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে যাবে, এবং প্রতিষ্ঠানটি সেই লেনদেনের রেকর্ড রাখবে যাতে এই লেনদেন নিয়ে দুইজনের কেউ কোন প্রশ্ন না তুলতে পারে। এই মাঝখানের প্রতিষ্ঠানটি হল ব্যাংক।

কেমন হতো যদি আপনি তৃতীয় কোন পক্ষ কিংবা ব্যাংকের আশ্রয় না নিয়ে কোন উপায়ে মিসরের সেই ব্যবসায়ীকে টাকা দিতে পারতেন? এখানে আমরা মূলত একটি প্রসেস নিয়ে চিন্তা করছি যা একটি ব্যাংকের চাইতে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে কোন অর্থ লেনদেন নিশ্চিত করবে। এমনকি সেই সিস্টেমে থাকবে না হ্যাংকি কিংবা কোন ধরণের লুটপাটের সম্ভাবনা।

আসলে এই প্রযুক্তির নাম হল ব্লকচেইন, যাকে বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তিবিদ ভবিষ্যতের ব্যাংকিং টেকনোলজি হিসাবে দেখছেন এবং কিছু প্রভাবশালী দেশের কয়েকটি ব্যাংক ইতোমধ্যে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এই প্রযুক্তির পেছনে। ব্লকচেইন সিস্টেম এবং সেটার জন্য প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন ডিজাইন ও ডেভেলপ করেন যিনি তার নাম সাতোশি নাকামোতো। 'যিনি' কথাটা এখানে সম্ভবত ঠিক নয়, কেননা সাতোশি নাকামতোর পরিচয় এখনও জানা যায়নি। এটা হতে পারো কোন ব্যাক্তি, গোষ্ঠি, প্রতিষ্ঠার বা কোম্পানির কোডনেম।

এতক্ষণ পর্যন্ত ঠিকই ছিলো। এখন নিশ্চইয় ভাবছেন এই ব্লকচেইন আবার কি! তাহলে চলুন ব্লক চেইন নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

ব্লকচেইন কি?
মোটামুটি নির্দিষ্ট একটি সময়ের মধ্যে সারা পৃথিবী জুড়ে যত অর্থের বা সম্পদের লেনদেন হচ্ছে সেই লেনদেনের সকল এনক্রিপটেড তথ্য একসাথে নিয়ে একটা ব্লক বানানো হয়। সেই ব্লক দিয়ে ক্রমানুসারে সাজানো সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয় একটা ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড লেজারকেই মূলত ব্লকচেইন বলা হয়। কেমন যেন ঘোলাটে লাগছে সব কিছু, তাইনা! বিটকয়েন কে আমরা এখন অনেকেই চিনি। এখানে আমরা যে ব্লক চেইনের কথা বলছি তার একটা উদাহরণ হচ্ছে বিটকয়েন ব্লকচেইন। বিটকয়েন একটা ক্রিপ্টোকারেন্সি যা কোন একটা ব্লকচেইন ব্যবহার করে পরিচালিত হয়।

ব্যাংকের যাবতীয় লেনদেন রেকর্ড করার জন্য সকল শাখায় একটা বড় সাইজের খাতা থাকে। আর যে ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে, তাদের এই রেকর্ড থাকে ডেটাবেইজে। হয়তো, সেই পুরানো খাতাতেও থাকে। এই বড় সাইজের খাতাটাকে বলে লেজার। তো একটা ভ্যালিড ট্রানকেজশানের জন্য অবশ্যই ব্যাংকের লেজারে সেটার এন্ট্রি থাকতে হবে। ব্লকচেইন এরকম একটা লেজার, যেখানে পাশাপাশি একটার পর একটা এরকম অনেকগুলো ব্লক থাকে। প্রত্যেকটা ব্লকের ভিতর থাকে একটা সময়ে মাঝে সারা পৃথিবীতে যত ট্রানজেকশান হয়েছে সেটার সকল ডেটা। এই ডেটা ওপেন কিন্তু এনক্রিপ্টেড অর্থাৎ সবাই দেখতে পারবে এই ডেটা কিন্তু পড়তে গেলে প্রাইভেট কী লাগবে। অর্থাৎ আপনি যদি এখানে ট্রাঞ্জেকশান করে থাকেন তাহলে শুধুমাত্র আপনি এখান থেকে আপনার ট্রানজেকশনের সকল তথ্য সেটার প্রাইভেট কী ব্যাবহার করে পড়তে পারবেন, অন্য কেউই পারবেনা। তবে মানুষ যেটা দেখবে তা হল ট্রানজেকশনের পরিমাণ। তবে কার অর্থ কার কাছে গিয়েছে সেটা এভাবে জানা যাবেনা। কেননা শুধুমাত্র এড্রেস দিয়ে চলে যাবে টাকা। কোন পরিচয় থাকবেনা।

নিচের ছবিতে দেখা যাবে একটা ট্রানজেকশান দেখতে কেমন। ব্লকচেইনের প্রত্যেকটা ব্লক সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয়। একবার চেইনে একটা ব্লক যোগ হয়ে গেলে সেটাতে কোন প্রকারের পরিবর্তন অসম্ভব। ব্লকগুলো পাশাপাশি তাদের সৃষ্টির ক্রমানুসারে বসে। প্রত্যেকটা ব্লক তার আগে কোন ব্লক আছ সেটা জানে। এভাবে একটা ব্লকের সাথে আরেকটা কানেক্টেড। ব্লকচেইন ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড সিস্টেম, অর্থাৎ সারা পৃথিবীতে বলতে গেলে একই ব্লকচেইনের সব ইউজার বা ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষ ইউজারদের কাছে একেবারে কার্বন কপি আছে। কাজেই একটা বা শ-খানেক সার্ভার বা কম্পিউটার একসাথে নস্ট হয়ে গেলেও ব্লকচেইনের কিছুই হবেনা।

ক্রিপটোকারেন্সিঃ
আমাদের প্রচলিত মুদ্রার মত ক্রিপ্টোকারেন্সি ও এক প্রকার মুদ্রা বা বিনিময় মাধ্যম। অর্থাৎ প্রচলিত মুদ্রা যেমন, ডলার, পাউন্ড, টাকা ইত্যাদি দিয়ে যে কাজ করা যায়, ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়েও সেই একই কাজ করা যায়। ব্লকচেইন টেকনোলজির মাধ্যমে লেনদেনের জন্য এই ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করা হয়। এইরকম মুদ্রা অনেক আছে, যেমন বিটকয়েন, বিটক্যাশ, মোনেরো, লাইটকয়েন ইত্যাদি। আমাদের মুদ্রা যেমন, ডলার, পাউণ্ড, টাকা ইত্যাদির দাম বিভিন্ন সময় ওঠানামা করে, এগুলোর ক্ষেত্রেও তাই, অর্থাৎ ক্রয়/বিক্রয় মূল্য ওঠানামা করে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি
ক্রিপ্টোকারেন্সি
তো এতক্ষণে নিশ্চইয় বুঝতে পেরেছেন ক্রিপ্টোকারেন্সি মানে কি। চলুন এবার তাহলে ক্রিপ্টোকারেন্সির কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

ক্রিপ্টোকারেন্সি ( যেমন ধরুন, বিটকয়েন) একটি নেটওয়ার্কের মতো। প্রতিটি পিয়ারের সমস্ত লেনদেনের সম্পূর্ণ ইতিহাস এবং এইভাবে প্রতিটি অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্সের রেকর্ড আছে। যেমন একটি ট্রান্সজেকশন ফাইল বলছে, "শামছুল x পরিমাণ বিটকয়েন অ্যালিস্কে দেয়" এবং এটি শামছুল হকের ব্যাক্তিগর কী দ্বারা সাক্ষরিত। এটি মৌলিক পাবলিক কী ক্রিপ্টোগ্রাফি। স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে একটি লেনদেন পুরো নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি এক পিয়ার থেকে অন্য পিয়ারে পাঠানো হয়। এটি মৌলিক P2P প্রযুক্তি। নিচের ইনফোগ্রাফ থেকে ধারণা পাওয়া যাবে কিভাবে ব্লকচেইন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি কাজ করে। ছবিটিতে ক্লিক করলে বড় আকারে দেখঅ যাবে।

Blockchain Infographic [www.pwc.com]
Blockchain Infographic [www.pwc.com]
লেনদেনটি অতি দ্রুত সম্পন্ন হয়। তবে নির্দিষ্ট সময় পরে নিশ্চিত হয়। অনেকটা কোন একাউন্ট অ্যাকটিভ করার মাধ্যমে কনফার্ম করার মতো। এই কনফার্ম বা নিশ্চিতকরণ ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যতক্ষণ লেনদেন অনিশ্চিত হয় ততক্ষণ, এটি মুলতুবি আছে এবং জাল করা হতে পারে। যখন একটি লেনদেন নিশ্চিত করা হয়, এটি পুরোপুরিভাবে লেজারে সেট করা হয়। এটিকে আর সংশোধন করা যাবেনা, মুছে ফেলা যাবে না। অর্থাৎ লেজারের তথ্য আর আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন না। এই প্রসেসটিই মূলত ব্লকচেইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা আগেই আলোচনা করা হয়েছে।
শুধুমাত্র মাইনাররা ট্রানজেকশন নিশ্চিত করতে পারবেন। মূলত ক্রিপ্টোকারেন্সি নেটওয়ার্কে এটিই মাইনারদের কাজ। তারা ট্রানজেকশন গ্রহন করে, লেজারে জমা রাখার পর নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে দেয়। যখনি মাইনার কর্তৃক ট্রানজেকশন নিশ্চিত করা হয়, তখনি সেটা অপরিবর্তনীয় ব্লকচেইনের অংশ হয়ে যায়। এই কাজের জন্য মাইনাররা ক্রিপ্টোকারেন্সির টোকেন (ফী বলা যায়) লাভ করে (যেমন: বিটকয়েন)। যেহেতু মাইনরদের কার্যকলাপ ক্রিপ্টোকুরেন্স-সিস্টেমের একক সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাই আমরা মাইনরদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবো।

প্রচলিত সকল মুদ্রার নিয়ন্ত্রক হল কোন দেশের সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারি হোক বা আমেরিকার মত প্রাইভেট হোক, দেশের অর্থনীতি এবং আরও অন্যান্য কিছু বিষয় বিবেচনা করে নতুন কারেন্সি তৈরি করতে পারে। সোজা বাংলায় নতুন 'ব্যাংক নোট' ছাপতে দিতে পারে। অর্থাৎ সেটা নিয়ন্ত্রকেরা নিজেদের ইচ্ছামত করতে পারে, কার লাভ কার ক্ষতি সেটা নিয়ে তাদের মাথা না ঘামালেও তাদের চলে অনেকসময়। যেমন, আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টাকা ছাপা হওয়ার কারনে আমাদের মুদ্রাস্ফীতি আছে।

কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে তৈরি হয়। এখানে নতুন কারেন্সি বা বিটকয়েন আসে প্রতি ১০ মিনিটে একটি ক্রিপ্টোগ্রাফিক পাজল সমাধান করার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। আর এই পাজল প্রতিযোগিতাই হয় মাইনারদের মাধ্যমে।

যারা এনক্রিপশান সম্পর্কে জানে, তাদের কাছে SHA256 এনক্রিপশান পরিচিত হওয়ার কথা। যারা পরিচিত না, এটুকু জানলেই হবে, যে কোন ডেটাকে SHA256 এ যদি এনক্রিপ্ট করা হয় তাহলে ওই ডেটার জন্য একটা হ্যাশ পাওয়া যায়। হ্যাশ হল বোঝার সুবিধার্থে, "000001beeca3785d515897041af0a7" এরকম কিছু একটা। এখন এই ডেটা থেকে যদি অতি সামান্য কোন কিছুও পরিবর্তন হয়, তাহলে একটি ভিন্ন হ্যাশ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ এভাবে এনক্রিপ্ট করলে নির্দিষ্ট একটা ডেটার জন্য হ্যাশ সর্বদা একই হবে, এবং সবার কম্পিউটারেই একই হবে।

এখন লক্ষ করি, উপরে যে হ্যাশটা আমি ব্যবহার করেছি ওখানে শুরুতে ৫টা জিরো আছে। এটা ইচ্ছাকৃত। এবং এটাই সেই ক্রিপটোগ্রাফিক পাজল যেটার কথা একটু আগে বলেছি। প্রতি মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে বিটকয়েনের ব্লকচেইনে অসংখ্য লেনদেন চলছে। ব্লকচেইনে নতুন একটা ব্লক যোগ হওয়ার পর থেকে আনুমানিক ১০ মিনিট ধরে পেন্ডিং ট্রানজেকশনের ডেটা বিটকয়েন সিস্টেমের সকল মাইনারদের কম্পিউটারে জমতে থাকে। তো কথা হচ্ছে মাইনার মানে আমরা নিজেরা এবং আমরা কম্পিউটার নিয়ে বসে আছি পাজল সমাধান করার জন্য।

এখন আমাদের বা মাইনারদের টার্গেট হল, যে ডেটা আমাদের কাছে এই মুহূর্তে আছে সেটা, আগের ব্লকের হ্যাশ এবং তার সাথে আরেকটা Random Number (এখানে একে Nonce = Number Used Once বলা হয়) মিলিয়ে উপরের মত শুরুতে ৫টা জিরো আছে এরকম প্যাটার্নের একটা হ্যাশ খুঁজে বের করা। এই ৫টা জিরো কেন? এটাকে বলা হয়, ডিফিকাল্টি লেভেল, অর্থাৎ শুরুতে কয়টা জিরো বসবে সেটা আসলে পাজলটা সমাধান করা কত কঠিন সেটা নির্দেশ করে।

এভাবে মুহূর্তের মধ্যে সারা পৃথিবীতে হাজার হাজার মাইনার তাদের কম্পিউটারে সেই কাঙ্ক্ষিত হ্যাশ খুঁজে বের করার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। এই প্রসেস আসলে কোন বিশেষ অ্যালগরিদম বা বুদ্ধি দিয়ে জেতা যাবেনা। একেবারে বাংলা পদ্ধতিতে একটার পর একটা Nonce বা এক্সপ্রেশন প্রয়োগ করে চেক করতে হবে সেই প্যাটার্নের হ্যাশ পাওয়া গেল কিনা।

এই প্রতিযোগিতায় যে মাইনার সবার আগে এই হ্যাশ খুঁজে বের করতে পারে যে জয়ী। হ্যাশ খুঁজে পাওয়া মানে হল, নতুন একটা ব্লকচেইনের জন্য নতুন একটা ব্লক তৈরি হওয়া। চমৎকার না? বাকি মাইনার যারা জিততে পারলোনা তাদের কাজ হল, বিজয়ী মাইনারের রেজাল্ট সঠিক কিনা সেটা ভেরিফাই করা। এভাবে সম্ভবত ৫১.৭% মাইনার ভেরিফাই করে দিলে তখন, নতুন ব্লকটা একটা পরীক্ষিত বা সঠিক ব্লক হিসাবে ব্লকচেইনে যোগ হয়ে যায়।

বিটকয়েন কিভাবে কাজ করে তার একটা ভিজুয়াল আইডিয়া নিচের ভিডিও থেকে পাওয়া যেতে পারে।


বাংলায় ব্লকচেইন নিয়ে যত লিখা আছে তার মাঝে মিডিয়ামের ব্লকচেইন এ ভবিষ্যৎ! লিখাটি সবচেয়ে বেশি সহজ এবং ভালো বলে মনে হয়েছে আমার। সকল তথ্য খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অবশ্যপাঠ্য!

ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে অনেক আলোচনা করা হলো।ক্রিপ্টোকারেন্সির অনেক ধরণের প্রকারভেদ আছে।যদি বিটকয়েন অধিক ব্যবহৃত ক্রিপ্টোকারেন্সি।এছাড়াও অনেক ধরণের ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে।

অন্যদিকে ক্রিপ্টোকারেন্সির সিকিউরিটি নিয়েও অনেকের সন্দেহ থাকতে পারে। বাকী সব ক্রিপ্টোকারেন্সি, ক্রিপ্টোকারেন্সির নিরাপত্তা এবং ভবিষৎ নিয়ে আগামী পর্বে আলোচনা করা হবে। সবাইকে সেই পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে আজকে এখানেই শেষ করছি।অনলাইনে লেনদেনে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা বিটকয়েন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার হয়ে আসছে বেশ কয়েক বছর থেকে এবং দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই ‘ক্রিপটোকারেন্সি’। বাংলাদেশেও সম্প্রতি এর লেনদেন শুরু হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বিটকয়েনের আইনি কোনো ভিত্তি নেই। আর ঝুঁকি এড়াতে এ দিয়ে লেনদেন কিংবা এর প্রসারে সহায়তা কিংবা প্রচার থেকে বিরত থাকতে সবাইকে অনুরোধ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার প্রচলন করে। এ ধরনের মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি নামে পরিচিতি পায়। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সে ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেওয়া হয় বিটকয়েন।এছাড়াও আছে ইথিরিয়াম, রিপেল, লাইটকয়েন। তবে সবার থেকে জনপ্রিয় বিটকয়েন।
কিন্তু বিটকয়েন কী? আর কীভাবেই বা কাজ করে বিটকয়েন? আসুন তা জেনে নেয়া যাক-

বিটকয়েন কী?
উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, বিটকয়েন হল এক ধরনের ‘মুদ্রা’ যা দিয়ে অনলাইনে লেনদেন করা যায়। এটিকে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ক্রিপটোগ্রাফিক কারেন্সি বলা হয়। মূলত এটি হল ওপেন সোর্স ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রোটকলের মাধ্যমে লেনদেন হওয়া সাংকেতিক মুদ্রা। বিটকয়েনের সবথেকে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এটি লেনদেনের জন্য কোন ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না। আর তাই প্রয়োজন হয় না কোন অনুমোদনেরও। আর ইন্টারনেটে লেনদেনকারীদের নিকট খুবই জনপ্রিয় বিটকয়েন।

ইতিহাস
অস্ট্রেলিয়ার এক কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ী সাতোশি নাকামোতো ২০০৮ সালে এই মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন করেন। তিনি এ মুদ্রা ব্যবস্থাকে পিয়ার-টু-পিয়ার লেনদেন নামে অভিহিত করেন।বিটকয়েনের লেনদেনটি বিটকয়েন মাইনার নামে একটি সার্ভার কর্তৃক সুরক্ষিত থাকে। পিয়ার-টু-পিয়ার যোগাযোগ ব্যাবস্থায় যুক্ত থাকা একাধিক কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মধ্যে বিটকয়েন লেনদেন হলে এর কেন্দ্রীয় সার্ভার ব্যবহারকারীর লেজার হালনাগাদ করে দেয়। একটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে নতুন বিটকয়েন উৎপন্ন হয়। ২১৪০ সাল পর্যন্ত নতুন সৃষ্ট বিটকয়েনগুলো প্রত্যেক চার বছর পরপর অর্ধেকে নেমে আসবে। ২১৪০ সালের পর ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন তৈরী হয়ে গেলে আর কোন নতুন বিটকয়েন তৈরী করা হবে।

কার্যপ্রণালী
বিটকয়েনের লেনদেন হয় পিয়ার টু পিয়ার বা গ্রাহক থেকে গ্রাহকের কম্পিউটারে। আগেই বলা হয়েছে এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান নেই। বিটকয়েনের সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অনলাইনে একটি উন্মুক্ত সোর্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে। বিটকয়েন মাইনারের মাধ্যমে যেকেউ বিটকয়েন উৎপন্ন করতে পারে। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় অনুমানযোগ্য এবং সীমিত। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার সাথে সাথে এটি গ্রাহকের ডিজিটাল ওয়ালেটে সংরক্ষিত থাকে। এই সংরক্ষিত বিটকয়েন যদি গ্রাহক কর্তৃক অন্য কারও একাউন্টে পাঠানো হয় তাহলে এই লেনদেনের জন্য একটি স্বতন্ত্র ইলেক্ট্রনিক সিগনেচার তৈরী হয়ে যায় যা অন্যান্য মাইনার কর্তৃক নিরীক্ষিত হয় এবং নেটওয়ার্কের মধ্যে গোপন অথচ সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত হয়। একই সাথে গ্রাহকদের বর্তমান লেজার কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে হালনাগাদ হয়। বিটকয়েন দিয়ে কোন পণ্য কেনা হলে তা বিক্রেতার একাউন্টে পাঠানো হয় এবং বিক্রেতা পরবর্তীতে সেই বিটকয়েন দিয়ে পুনরায় পণ্য কিনতে পারে, অপরদিকে সমান পরিমাণ বিটকয়েন ক্রেতার লেজার থেকে কমিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যেক চার বছর পর পর বিটকয়েনের মোট সংখ্যা পুনঃনির্ধারন করা হয় যাতে করে বাস্তব মুদ্রার সাথে সামঞ্জস্য রাখা যায়।

সুবিধা-অসুবিধা
অনলাইনে যারা লেনদেন করেন তাদের জন্য খুবই সুবিধাজনক বিটকয়েন। যাদের বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন করার মত সুযোগ নেই বা ক্রেডিট কার্ড নেই তাদের জন্যও ব্যাপক উপকারি এ বিটকয়েন। তবে কোন ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান না থাকা এবং এর কার্যক্রম তদারকি করার কোন সুযোগ না থাকায় অপরাধীদের কাছেও খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিটকয়েন। বৈধ লেনদেনের পাশাপাশি অবৈধ লেনদেনেও ব্যবহৃত হয় বিটকয়েন। জুয়া খেলা বা বাজি ধরা, অবৈধ পণ্য কেনা-বেচা ইত্যাদির লেনদেনে ব্যবহৃত হয় বিটকয়েন।মাদক চোরাচালান এবং অর্থপাচার কাজেও বিটকয়েনের ব্যবহার আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আলোচনা-সমালোচনা
সম্প্রতি কানাডার ভ্যানক্যুভারে বিটকয়েন এর প্রথম এটিএম মেশিন চালু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এটি বিটকয়েনকে আরও আগিয়ে নিয়ে যাবে। মাদক, চোরাচালান অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা ও অন্যান্য বেআইনি ব্যবহার ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডীয় সরকার বিটকয়েনের গ্রাহকদের নিবন্ধনের আওতায় আনার চিন্তাভাবনা করছে। অন্যদিকে অনেক দেশই অবস্থান নিচ্ছে বিটকয়েনের বিরুদ্ধে। দিও বিটকয়েন ডিজিটাল কারেন্সি হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিপরীতে এর দর মারাত্মক ওঠানামা, দুষ্প্রাপ্যতা এবং ব্যবসায় এর সীমিত ব্যবহারের কারণে অনেকেই এর সমালোচনা করেন।এখন যুগ ভার্চুয়াল মুদ্রা বা বিটকয়েনের। কিন্তু কি এই ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল মুদ্রা? ডিজিটাল মুদ্রার আদান-প্রদান হয় অনলাইনে। বিনিময়ের সব তথ্য গোপন থাকে, বেশির ভাগ সময়েই থাকে অজ্ঞাত। ধরুন, আপনার অর্থ আছে, কিন্তু পকেটে নেই। ব্যাংকে বা সিন্দুকেও সেই অর্থ রাখা হয়নি। রাখা হয়েছে ইন্টারনেটে। কোনো দিন ছুঁয়েও দেখতে পারবেন না অনলাইনে রাখা ওই অর্থ। শুধু ভার্চ্যুয়াল জগতের এ মুদ্রাকেই বলা হয় ডিজিটাল মুদ্রা বা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা।

ডিজিটাল মুদ্রার আদান-প্রদান হয় অনলাইনে। বিনিময়ের সব তথ্য গোপন থাকে, বেশির ভাগ সময়েই থাকে অজ্ঞাত। এ ধরনের ডিজিটাল মুদ্রাকে বলা হয় ক্রিপ্টোকারেন্সি। এ ধরনের মুদ্রার বিনিময়ে ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি নামের একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে প্রচলিত ভাষা বা সংকেতে লেখা তথ্য এমন একটি কোডে লেখা হয়, যা ভেঙে তথ্যের নাগাল পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতিতে ব্যবহারকারী ছাড়া অন্য কারও কোনো কেনাকাটা বা তহবিল স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া বেশ কঠিন।

এরপরও ডিজিটাল মুদ্রার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা ঘটে গেছে গত শুক্রবার। টোকিওভিত্তিক ডিজিটাল মুদ্রার বিনিময় প্রতিষ্ঠান কয়েনচেকের কম্পিউটার ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক হ্যাক করে মোট ৫৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার মূল্যমানের ডিজিটাল মুদ্রা খোয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২ লাখ ৬০ হাজার গ্রাহক। তবে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের খোয়া যাওয়া অর্থের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার আশ্বাস জানিয়েছে কয়েনচেক। হ্যাকিংয়ে অর্থ চুরির ঘটনায় নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা নিয়ে তোপের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোপনে ও নিরাপদে যোগাযোগের জন্য ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছিল। গাণিতিক তত্ত্ব ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিপ্টোগ্রাফিরও উন্নতি হয়েছে। এতে অনলাইনে ডিজিটাল মুদ্রা সংরক্ষণ ও আদান-প্রদানের বিষয়টি আরও নিরাপদ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

অবশ্য এত নিরাপত্তা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে ডিজিটাল মুদ্রার বিভিন্ন বিনিময় প্রতিষ্ঠানে বেশ কটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল মুদ্রা হিসেবে বিটকয়েনের আবির্ভাব ঘটে। বর্তমানে ইন্টারনেটে এক হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে। কয়েনচেক থেকে চুরি হয়েছে স্বল্প পরিচিত মুদ্রা এনইএম। গত বছরের ডিসেম্বরে নাইসহ্যাশ নামের স্লোভেনিয়ার একটি কোম্পানির মাত কোটি ডলারের বিটকয়েন চুরি হয়। বিটকয়েন চুরির ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালেও। এরও আগে ২০১৪ সালে মুদ্রা চুরির শিকার হয়েছিল আরেক বিনিময় প্রতিষ্ঠান এমটিগক্স। তাদের নেটওয়ার্ক থেকে ৪০ কোটি ডলার চুরি গিয়েছিল। চুরির ঘটনা স্বীকার করার পর ওই প্রতিষ্ঠান শেষে বন্ধই হয়ে যায়।

ডিজিটাল মুদ্রা কোনগুলো?
বিশ্বে এখন হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু আছে। তবে বিনিময় মূল্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে নিচের ডিজিটাল মুদ্রাগুলো:

বিটকয়েন: এখন পর্যন্ত চালু থাকা ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিটকয়েন। এর বিনিময় মূল্যও সবচেয়ে বেশি। সাতোশি নাকামোতো ২০০৯ সালে বিটকয়েন তৈরি করেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বিটকয়েনের বাজার পুঁজির পরিমাণ ছিলে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার। কিছুদিন আগে একটি বিটকয়েনের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২০ হাজার ডলার। তবে চলতি বছরে বিনিময় মূল্যের এই হার প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায়।

এথেরিয়াম: ২০১৫ সালে তৈরি হয় এথেরিয়াম। বিটকয়েনের মতো এই মুদ্রারও নিজস্ব হিসাবব্যবস্থা আছে। বিনিময় মূল্যের দিক থেকে এটি দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে বিটকয়েনের পরই আছে এথেরিয়াম। গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার বাজারে পুঁজির পরিমাণ প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০১৬ সালে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর এটি দুটি মুদ্রায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এর বিনিময় মূল্য ৮৪০ ডলারে পৌঁছেছিল। তবে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর প্রতিটি এথেরিয়াম মুদ্রা ১০ সেন্টে বিক্রির ঘটনাও ঘটেছিল।

রিপল: ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রিপল। শুধু ক্রিপ্টোকারেন্সি নয়, অন্যান্য ধরনের লেনদেনও করা যায় এই ব্যবস্থায়। প্রচলিত ধারার বিভিন্ন ব্যাংকও এই ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করছে। বাজারে ১০ বিলিয়ন ডলারের পুঁজি আছে রিপলের।

লাইটকয়েন: বিটকয়েনের সঙ্গে বেজায় মিল আছে লাইটকয়েনের। তবে বিটকয়েনের চেয়ে দ্রুত লেনদেন করা যায় লাইটকয়েনে। এর বাজার মূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার।

‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা-পদ্ধতিতে প্রতিটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্লকচেইন’ নামের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। ছবি: রয়টার্স
‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা-পদ্ধতিতে প্রতিটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্লকচেইন’ নামের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। ছবি: রয়টার্স

কীভাবে কাজ করে ডিজিটাল মুদ্রা?
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিপ্টোকারেন্সি একধরনের বিকেন্দ্রীকৃত প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইনে নিরাপদে অর্থ পরিশোধ করা যায়। আমানতকারীর নাম গোপন রেখে এবং ব্যাংকে না গিয়েই অর্থ জমা রাখা যায়।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থার মতো সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল মুদ্রা ছাপায় না। ‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা পদ্ধতিতে একেকটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত এক বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘ব্লকচেইন’। এই ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ লেনদেনসহ বন্ড, স্টক ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদের কেনাকাটাও করা যায়।

ব্যবহারকারীরা অনলাইনে ব্রোকারদের কাছ থেকেও বিভিন্ন ডিজিটাল মুদ্রা কিনতে পারেন। অনলাইনে ‘ক্রিপ্টোগ্রাফিক ওয়ালেট’ নামক নিরাপদ স্থানে রাখা যায় এই মুদ্রা।

নির্দিষ্ট ডিজিটাল মুদ্রা যত বেশি মানুষ কেনে, সেই মুদ্রার বাজার দর তত বাড়ে। এভাবেই শেয়ার বাজারের মতো নিয়মিত ওঠানামা করে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময় মূল্য। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবহারকারী পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন থাকে বলে অনেক সময় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার বেশি দেখা যায়।

বিশ্বে এখন হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু রয়েছে। তবে বিনিময় মূল্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বিটকয়েন।

কেন ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোকারেন্সি?
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচয় গোপন ও লেনদেন ব্যবস্থায় কঠোর নিরাপত্তা—এই দুটি বিষয়ই হলো ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রাব্যবস্থায় আকৃষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ। এই ব্যবস্থায় একবার লেনদেন হওয়ার পর তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। একই সঙ্গে লেনদেনের খরচ কম হওয়ায় এটি গ্রাহকদের কাছে বেশি নির্ভরযোগ্যতা অর্জন করেছে। এর প্রযুক্তিব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকৃত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, সবার হাতের কাছেই থাকে ডিজিটাল মুদ্রা। যেখানে প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থায় ব্যাংক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্ট না খুললে সেবা পান না কোনো গ্রাহক।

ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে আকৃষ্ট হওয়ার আরেকটি কারণ হলো এতে কম বিনিয়োগ করেই ব্যাপক লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ, প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থার তুলনায় ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর বিনিময় মূল্যের ওঠা-নামা বেশি। তাই রাতারাতি ধনী হওয়ার সুযোগও থাকে। ঠিক এই কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিটকয়েন বা অন্যান্য শীর্ষ ডিজিটাল মুদ্রায় বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে।

তবে এর কিন্তু উল্টো দিকও আছে। অর্থাৎ দর বেড়ে গেলে যেমন ধনী হওয়ার সুযোগ আছে, তেমনি হুট করে দর নেমে গেলে রাস্তাতেও নামতে পারেন। আবার কঠোর গোপনীয়তা থাকায় অবৈধ কর্মকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট লেনদেনে পছন্দের শীর্ষে আছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। তাই বিনিয়োগকারীদের এসব বিষয়ে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে।বর্তমানে ফেসবুক কিংবা ইউটিউবের কল্যাণে আমাদের সবাই হয়তো কখনো না কখনো বিটকয়েন শব্দটি শুনেছি। কিন্তু বিটকয়েন সম্পর্কে বিস্তারিত আমরা অনেকেই ভালোভাবে জানি না। বিটকয়েন কী? কীভাবে কাজ করে? কী কী কাজে ব্যবহার করা হয়? চলুন জেনে নেয়া যাক এসব প্রশ্নের উত্তর।

বিটকয়েন কী?
বিটকয়েন হলো একধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি। আর ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো এমন একধরনের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থা যার কোনো ফিজিক্যাল বা বাস্তব রূপ নেই। বিটকয়েন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি।



বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো বিটকয়েন; Source: crypto-news.net

সাধারণত আমরা টাকা-পয়সা লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি তৃতীয় পক্ষীয় সংস্থার আশ্রয় নেই। যেমন মনে করুন, আপনি আপনার বন্ধুকে কিছু টাকা পাঠাবেন। এক্ষেত্রে আপনি আপনার ফোনের বিকাশ/রকেট একাউন্ট থেকে আপনার বন্ধুকে টাকাটি পাঠিয়ে দিলেন। এখানে আপনি প্রেরক, আপনার বন্ধু প্রাপক এবং বিকাশ/রকেট তৃতীয় পক্ষ, যে কিনা সমস্ত লেনদেন প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করলো এবং এর জন্য কিছু চার্জ আদায় করলো।

কিন্তু বিটকয়েন এমন একটি মুদ্রা ব্যবস্থা যাতে অর্থ আদান-প্রদানের জন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হয় না। প্রেরকের কাছ থেকে সরাসরি বিটকয়েন প্রাপকের কাছে পৌছে যায়। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘পিয়ার টু পিয়ার’ (peer-to-peer)। এক্ষেত্রে সমস্ত লেনদেন প্রক্রিয়াটি হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করে যা অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি প্রক্রিয়া। যেহেতু কোনো তৃতীয় পক্ষীয় সংস্থা এই লেনদেন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে না, সেহেতু বিটকয়েনের লেনদেনের গতিবিধি নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। অর্থাৎ কে কাকে বিটকয়েন পাঠাচ্ছে তার পরিচয় কেউ জানতে পারে না। পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখেই বিটকয়েন লেনদেন করা যায়।

যেভাবে এলো এই বিটকয়েন
২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট। এই দিনে ইন্টারনেট জগতে ‘bitcoin.com’ নামের একটি ওয়েবসাইটের ডোমেইন রেজিস্টার করা হয়। এ বছরেরই নভেম্বর মাসে ‘সাতোশি নাকামোতো’ ছদ্মনামে এক ব্যক্তি বা একটি দল ‘Bitcoin: A Peer-to-Peer Electronic Cash System’ নামে একটি গবেষণাপত্র অনলাইনে প্রকাশ করেন। এই গবেষণাপত্রটিতেই সর্বপ্রথম বিটকয়েন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে সাতোশি নাকামোতো বিটকয়েন তৈরি করার সফটওয়্যারের কোড অনলাইনে রিলিজ করেন। তৈরি হয় বিটকয়েন ‘মাইনিং’ এর সফটওয়্যার। বিটকয়েন মাইনিং হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বিটকয়েন তৈরি করা হয়। ২০০৯ সালের এই জানুয়ারি মাসেই সাতোশি বিশ্বের প্রথম বিটকয়েন তৈরি করেন।


কে এই সাতোশি নাকামোতো তা কেউ জানে না; Source: coindesk.com

বহু বার বহুজনকে সাতোশি নাকামোতো সন্দেহে গ্রেফতার করা হলেও প্রকৃত সাতোশি নাকামোতো কে, বা এই নামের পেছনে কে বা কারা আছে তা আজও জানা যায়নি।

যেভাবে কাজ করে বিটকয়েন
সাধারণ মুদ্রার মতো বিটকয়েন আপনি হাতে নিয়ে লেনদেন করতে পারবেন না। কোনো ব্যাংক কিংবা প্রতিষ্ঠান এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার কারণে বিটকয়েন প্রেরক থেকে সরাসরি প্রাপকের ‘ওয়ালেটে’ চলে যায়। ওয়ালেট হচ্ছে আপনার মানিব্যাগের মতো, যেখানে আপনার নিজের বিটকয়েন জমা থাকে। ওয়ালেট অনলাইন কিংবা অফলাইন দু’ধরনেরই হয়। অনলাইন ওয়ালেট ব্যবহারকারী তার স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটারের মাধ্যমে ব্যবহার করতে পারে।


স্মার্টফোনের মাধ্যমেই ব্যবহার করা যায় ডিজিটাল ওয়ালেট; Source: letstalkpayments.com

প্রতিটি ওয়ালেটের একটি নির্দিষ্ট এড্রেস বা ঠিকানা থাকে। ঠিকানাটি সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড হয় বলে এটি মনে রাখা অসম্ভব। বিটকয়েন লেনদেনের জন্য ব্যবহারকারী তার এই ঠিকানাটি ব্যবহার করে থাকেন।


ব্লকচেইনে জমা থাকে সব লেনদেনের হিসাব; Source: idmmag.com

এক এড্রেস থেকে অন্য এড্রেসে বিটকয়েন পাঠালে তা সাথে সাথে একটি উন্মুক্ত খতিয়ানে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়, যার নাম ‘ব্লকচেইন’। এটি এমনই বিশাল একটি খতিয়ান ব্যবস্থা যাতে এযাবতকালে যত বিটকয়েন লেনদেন হয়েছে তার সবগুলোরই রেকর্ড রয়েছে। প্রতিটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে নেটওয়ার্কে একটি নতুন বিট কয়েন তৈরি হয়। পদ্ধতিকেই বলা হয় বিটকয়েন মাইনিং।

যেভাবে করা হয় বিটকয়েন মাইনিং
বিটকয়েন মাইনিং একটি জটিল প্রক্রিয়া। একটি নির্দিষ্ট মাইনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হয়। এজন্য প্রয়োজন হয় উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কম্পিউটার। কম্পিউটারের সিপিইউ এবং জিপিইউ ব্যবহার করে জটিল কিছু গাণিতিক এলগরিদমের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।


একটি বিটকয়েন মাইনিং রিগ; Source: youtube.com

প্রতিটি বিটকয়েন লেনদেন করা হলে তা ব্লকচেইনে লিপিবদ্ধ হয়। এ সময় বিটকয়েন মাইনাররা মাইনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের বৈধতা নির্ণয় করেন। আর এ সময়ই একটি নতুন বিটকয়েন তৈরি হয়।

বিটকয়েন লেনদেন ও নতুন বিটকয়েন তৈরির এই সমস্ত প্রক্রিয়াটিই ঘটে অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে। ফলে এতে কোনো ধরনের ছলচাতুরী কিংবা প্রতারণার সম্ভবনা থাকে না। উভয় পক্ষেরই পরিচয় থাকে গোপন।

বিটকয়েনের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য
বিটকয়েন একটি সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীভূত মুদ্রা ব্যবস্থা। সরকার কিংবা কোনো কর্তৃপক্ষ এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার ফলে এখানে প্রত্যেক ব্যবহারকারী তাদের বিটকয়েনের প্রকৃত মালিক। অন্য কেউ তাদের বিটকয়েন নেটওয়ার্কের মালিকানা নিতে পারে না।
বিটকয়েন লেনদেনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিই হয় নাম বিহীনভাবে। একজন বিটকয়েন ব্যবহারকারী একাধিক বিটকয়েন একাউন্ট খুলতে পারে। এসব একাউন্ট খোলার জন্য কোনো ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন ব্যবহারকারীর নাম, ঠিকানা ইত্যাদি প্রয়োজন হয় না। ফলে ব্যবহারকারীর প্রকৃত পরিচয় থাকে গোপন।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে। প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড ব্লকচেইনে জমা থাকে যা যে কেউ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে যখন তখন দেখতে সক্ষম। ফলে এখানে কোনো দুর্নীতির সুযোগ নেই।
বিটকয়েন একাউন্ট খোলা খুবই সহজ। এক্ষেত্রে সাধারণ ব্যাংক একাউন্ট খোলার মতো কোনো ঝামেলাযুক্ত ফর্ম পূরণ করতে হয় না। কোন এক্সট্রা ফি-ও প্রয়োজন হয় না। কোনো কাগজপত্রও জমা দেওয়া লাগে না।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া খুবই দ্রুত। পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই বিটকয়েন পাঠানো হোক না কেন তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাপকের কাছে পৌঁছে যাবে।
বিটকয়েনের কিছু অসুবিধা
বিটকয়েন সম্পূর্ণ অফেরতযোগ্য। অর্থাৎ কেউ ভুল করে কোনো ভুল ঠিকানায় বিটকয়েন পাঠিয়ে দিলে তা আর ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে না। প্রেরক-প্রাপক উভয়ের পরিচয়ই সম্পূর্ণ গোপন থাকে। ফলে অনেক অপরাধমূলক কাজে বিটকয়েন ব্যবহার করা সম্ভব। অবৈধ পণ্যের কেনা বেচাতেও বিটকয়েন ব্যবহৃত হয়। ইন্টারনেটের গোপন অংশ ডার্ক ওয়েবের সমস্ত লেনদেন হয় বিটকয়েনের মাধ্যমে।
বিটকয়েনের মূল্য অনেকটাই অস্থিতিশীল। কখনো বিশাল পরিমাণে বাড়ে তো কখনো বিশাল ধস নামে।
বর্তমান বিশ্বে বিটকয়েনের মূল্য ও বাংলাদেশে এর অবস্থা
বিটকয়েন প্রথম চালু হওয়ার পর থেকে দিন দিন এর মূল্য বেড়েই চলেছে। ২০১১ সালে বিটকয়েনের বাজারমূল্য সর্বপ্রথম ০.৩০ ডলার থেকে ৩২ ডলারে উঠে। এরপর ২০১৩ সালে এর দাম উঠে যায় ২৬৬ ডলারে। এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বিটকয়েনের দাম। ২০১৬ সালের শেষের দিকে এই দাম চলে আসে ৬০০ ডলারের উপরে। এরপর ২০১৭ সালে বিটকয়েনের দাম বেড়ে যায় রেকর্ড পরিমাণ। প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার করে বাড়তে বাড়তে এ বছরের নভেম্বরে বিটকয়েনের দাম উঠে যায় ৯,০০০ ডলারের কাছাকাছি। আর এই ডিসেম্বর মাসেই এই দাম বেড়ে পরিণত হয় ১৫,০০০ ডলারেরও বেশিতে যা সত্যিই অভূতপূর্ব একটি ঘটনা।


বিটকয়েনের দাম বেড়েছে ব্যাপক হারে; Source: coindesk.com

বিশ্বের বহু দেশে বিটকয়েন অনেক জনপ্রিয়। ওয়ার্ডপ্রেস, মাইক্রোসফট, উইকিপিডিয়া, ওভারস্টকের মতো বিশ্বের প্রায় ত্রিশ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান বিটকয়েন গ্রহণ করে। দিন দিন এর জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বাড়ছে। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস পর্যন্ত বিটকয়েন নিয়ে মন্তব্য করছেন, “Bitcoin is better than currency“।

এখন চলুন দেখি বাংলাদেশে বিটকয়েনের অবস্থান নিয়ে। বাংলাদেশ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসাবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনে অন্তর্ভুক্ত হয় ২০১৪ সালের ১৫ আগস্টে। কিন্তু বিটকয়েন ফাউন্ডেশনে যুক্ত হওয়ার ঠিক এক মাসের মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় বিটকয়েনের সকল লেনদেনের উপর। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দেশে বিটকয়েনের সকল প্রকার লেনদেন থেকে জনগণকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানায়। অর্থাৎ বিটকয়েন লেনদেনকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশে বিটকয়েনের উপর এই নিষেধাজ্ঞা বজায় রয়েছে।ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ (bitcoin) এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। গত ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনের সদস্যপদ পেয়েছে।

ঢাকা: ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ (bitcoin) এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। গত ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনের সদস্যপদ পেয়েছে। কিন্তু বিটকয়েন কি, কিসের জন্য? কি কাজে প্রয়োজন? এরকম নানাবিধ প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে বাংলানিউজ তার পাঠকদের জন্য নিয়ে এসেছে বিটকয়েন-এর উপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন। প্রথম পর্বে থাকছে ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ পরিচিতি।

সাধারণত কাগজের তৈরি প্রচলিত মুদ্রা বা এ সংশ্লিষ্ট কোন ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্বলিত বস্তু ব্যবহার করে বাস্তব জীবনে এবং অনলাইনে লেনদেন সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো আপাতঃ দৃষ্টিতে কোন প্রকারের সমস্যা ছাড়াই মিটিয়ে ফেলা যায়। তবে বর্তমানে ব্যবহৃত এটিএম কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড অথবা অন্য ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্বলিত বস্তুগুলো ব্যবহারে দুটি বড় সমস্যা রয়েছে।

এসবে লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহক ও গ্রহিতা উভয়কে তৃতীয় কোন পক্ষের উপর ‘ট্রাস্ট’ বা আস্থা রাখতে হয়, উদাহরণস্বরূপ ব্যাংক। তৃতীয় পক্ষ এই ব্যাংকে উভয় পক্ষ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের মুদ্রা পরিশোধ করে, যেটিকে ইংরেজীতে বলে ‘ডাবল স্পেন্ডিং’।ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা ইথিরিয়াম জনপ্রিয় হচ্ছে। বিটকয়েনের পরেই রয়েছে এ মুদ্রা। বিটকয়েনের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই? প্রযুক্তি দুনিয়ায় হইচই তোলা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা বিটকয়েন। অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার প্রচলন করে। এ ধরনের মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি নামে পরিচিতি পায়। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সে ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেওয়া হয় বিটকয়েন।

ক্রিপ্টোকারেন্সির দুনিয়ায় বাজার দখলের দিক থেকে বিটকয়েনের পরের অবস্থানে আছে ইথিরিয়াম। ২০১৩ সালে ভিটালিক বুটকারিন প্রতিষ্ঠিত এ ভার্চ্যুয়াল মুদ্রায় ইথার নামের একটি ক্রিপটোকারেন্সি ব্যবহৃত হয়। অর্থ পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে ও মুদ্রা ব্যবহৃত হয়।

ইথিরিয়াম কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। এ মুদ্রা দিয়ে বিনিয়োগ, বিভিন্ন চুক্তিসহ নানা কাজ করা হয়। ইথিরিয়াম সাধারণত ‘স্মার্ট কনট্রাক্টসে’ ব্যবহৃত হয়। এ স্মার্ট কনট্রাক্টস হচ্ছে লেনদেনের প্রোটোকল বা প্রোগ্রাম যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই চুক্তির শর্ত পূরণ করে।

২০১৬ সাল থেকে এ মুদ্রা দিয়ে লেনদেন হয় এবং বর্তমানে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা জগতে ২৭ শতাংশ দখল করে রেখেছে। ডয়চে ব্যাংক ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের এক প্রতিবেদনে অনুযায়ী, প্রতি বছর এক কোটি ৮০ লাখ ইথারের বেশি অনুমোদন করা হয় না। ইথারের অনুমোদন সীমিত হওয়ায় প্রতিবছর এর চাহিদা বাড়ছে এবং আপেক্ষিক মুদ্রাস্ফীতি হার কম থাকে। এটি মূলত ইথহ্যাস মাইনিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে।

দ্য বিটকয়েন বিগ ব্যাং নামের বইয়ের লেখক ব্রায়ান কেলি লিখেছেন, ইথিরিয়ামের লক্ষ্য হচ্ছে কোনো ডেভেলপারের জন্য স্মার্ট কন্ট্রাক্ট লেখা সহজ করা বা ইথিরিয়াম ব্লকচেইনে চলবে। এ প্রযুক্তির প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না।

বিটকয়েন ও ইথিরিয়াম ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি ক্রিপটোকারেন্সি এখন আলোর মুখ দেখেছে। এর মধ্যে আছে রিপল, লাইটকয়েন, মনেরো, ড্যাশ, এনইএম প্রভৃতি
ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে আলোচনার আগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সচরাচর ব্যবহৃত মুদ্রাব্যবস্থা নিয়ে একটু জেনে নেয়া যাকঃ

বহু বছর আগে থেকেই মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী জিনিসপত্র লেনদেন করে আসছে। লেনদেনের সবচেয়ে প্রাচীন এবং অধিক প্রচলিত প্রথার মধ্যে অন্যতম ছিলো বিনিময় প্রথা। কিন্তু মানদন্ডের বিচারে সেখানে বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছেন। ধরা যাক, ফল ব্যবসায়ী শফিক সাহেবের একবস্তা চাল লাগবে এবং বিনিময়ে তাকে এক বস্তা তুলা দিতে হবে। কিন্তু শফিক সাহেবের কাছে কোন তুলা নেই। যেহেতু শফিক সাহেবের কাছে কোন তুলা নেই, তাহলে এখানে বিনিময় কার্য সম্পন্ন হতে পারছেনা।

বিনিময় প্রথার এই সমস্যা থেকে নিস্তার পাওয়ার লক্ষ্যে সবাই এমন একটা প্রথা উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো, যেখানে সব ধরণের পণ্যের একটা আদর্শ মূল্য থাকবে। উদাহরণ হিসেবে গোল্ডের কথা বলা যেতে পারে। অনেক বছর আগে থেকে এখনো গোল্ডকে সম্পদ পরিমাপের একটা একক হিসাবে ধরা হত। আগে সরাসরি গোল্ড লেনদেন হত, সেটা একসময় মানুষের প্রয়োজনমত কাগজের মুদ্রা ব্যাবস্থায় রূপ নেয়।

এভাবে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রা যেমন, টাকা, ডলার, পাউণ্ড, ইউরো ইত্যাদি এসেছে। দেশের অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই মুদ্রা ছেপে বাজারে ছাড়তে পারে মানুষের ব্যবহারের জন্য। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন বা সম্পদ আদান প্রদান সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো দেশের আইন অনুযায়ী সামলানোর জন্য তৈরি হয়েছে ব্যাংক বা ব্যাংকিং সিস্টেম। কিন্তু এতে করেও সমস্যার সমাধান হয়নি। পৃথিবীর ইতিহাসে বড় বড় ব্যাংক ডাকাতির ভয়াবহ গল্পগুলো শুনলে কার না হৃদয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়! তবুও সময় বয়ে যায়, আর মানুষ ও দমে যাবার পাত্র নয়। নিজের প্রয়োজনে তারা আবিষ্কার করে একের পর এক বিস্ময়। আজকে আমরা তেমনি এক বিস্ময়ের কথা বলবো।

বর্তমানে প্রচলিত নানান মূদ্রা
বর্তমানে প্রচলিত নানান মূদ্রা
মূল আলোচনায় যাবার আগে আমরা একটা কাল্পনিক দৃশ্যপট কল্পনা করার চেষ্টা করবো।

খুব ছোটবেলা থেকে আপনার অনেক ধরণের শখ আছে। এর মধ্যে অন্যতম শখ হচ্ছে আর্ট এন্ড কালচার। অর্থাৎ এই আধুনিকায়ন সভ্যতায় বসে আপনার দুষ্প্রাপ্য চিত্রকর্মের প্রতি বিশেষ আগ্রহ আছে। খুব ছোটবেলা থেকে সংগ্রহ করছেন। তাই নিজের এত বছরে সংগ্রহ করা চিত্রকর্ম নিয়ে আপনার ছোটখাটো একটা মিউজিয়াম আছে। কথায় আছে শখের তোলা ৮০, এর জন্য মূল্য ও দিতে হয় অনেক। এসব জিনিস সংগ্রহ করা এবং নিজের সংগ্রহে রাখা দুইটারই ঝামেলা অনেক। কারন এসবের উপর নানা ধরনের লোকজনের নজর থাকে, অনেক সময় এগুলো নিয়ে বড় ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধ কিংবা দুর্ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় শেষের দিকে অথবা চাকরি নিয়ে বেশ ব্যস্ত কিংবা এখন আর আগের মতো পেইন নিতে চান না, আবার শখের জিনিষ ছাড়তে ও চান না। তাই বেশ কিছুদিন ধরে ভাবছেন এমন কোন উপায় নিয়ে যা দিয়ে সংগ্রহের সকল আর্টগুলো এমনভাবে সংরক্ষণ করা যায় যেন,

প্রথমেই পণ্যের গুণগত মান নিশ্চায়ন করা।
আর্থিক লেনদেন এবং আইনগত ব্যাপারগুলো বাড়িতে বসে, বিনা ঝামেলায়, নীরবে এবং স্বল্পতম সময়ে করে ফেলা।
বিক্রয় করার সময় একটি স্বচ্ছ লেনদেন প্রক্রিয়া।
পণ্যের কঠোর নিরাপত্তা।
অর্থাৎ যদি কোন চোর কোনক্রমে আপনার কোন আর্ট চুরি করে বাইরে বিক্রি করতে যায়, তাহলে যেন সে চোরাই জিনিস বিক্রির দায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং চোর যদি পালিয়েও যায়, যে সেটা কিনেছে সে ধরা পড়ে চোরাই জিনিস কেনার অপরাধে।

বিনিময় প্রথা তো আর আপনার এই চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থা চাইলেই আপনার এই সমস্যা দূর করতে পারে। কিন্তু ঐ যে বললাম বড় বড় ব্যাংক ডাকাতির করুণ ইতিহাসের কথা। অন্যদিকে আপনি যে ধরণের আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যাংকগুলো এই মুহূর্তে দিতে পারছে না।

আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি সেই সাপেক্ষে ব্যাংকের ভূমিকা একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করি।

আপাতত আমরা এখানে ব্যাংকের গুরুত্ব বুঝানোর চেষ্টা করি। ধরে নিচ্ছি, আপনি আপনার চিত্রকলা সম্পর্কিত কোন কাজের জন্য মিসরের কোন এক পত্নতাত্ত্বিক ব্যবসায়ীর কাছে টাকা পাঠাবেন। তো আপনি জানেন কিংবা শুনেছেন যে প্রায় সময় তারা টাকা নিয়ে অনেক ধরণের অনৈতিক পথের আশ্রয় নেয়। তাই আপনি তাদের টাকা দিতে ঠিক ভরসা পাচ্ছেন না। যদি টাকা নিয়ে সে ব্যবসায়ী অস্বীকার করে! সুতরাং এক্ষেত্রে আপনার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান লাগবে যেখানে আপনি স্বাচ্ছন্দে টাকা আদান-প্রদান করতে পারবেন। অর্থাৎ আপনার অ্যাকাউন্টের টাকা আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিসরের সেই ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে যাবে, এবং প্রতিষ্ঠানটি সেই লেনদেনের রেকর্ড রাখবে যাতে এই লেনদেন নিয়ে দুইজনের কেউ কোন প্রশ্ন না তুলতে পারে। এই মাঝখানের প্রতিষ্ঠানটি হল ব্যাংক।

কেমন হতো যদি আপনি তৃতীয় কোন পক্ষ কিংবা ব্যাংকের আশ্রয় না নিয়ে কোন উপায়ে মিসরের সেই ব্যবসায়ীকে টাকা দিতে পারতেন? এখানে আমরা মূলত একটি প্রসেস নিয়ে চিন্তা করছি যা একটি ব্যাংকের চাইতে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে কোন অর্থ লেনদেন নিশ্চিত করবে। এমনকি সেই সিস্টেমে থাকবে না হ্যাংকি কিংবা কোন ধরণের লুটপাটের সম্ভাবনা।

আসলে এই প্রযুক্তির নাম হল ব্লকচেইন, যাকে বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তিবিদ ভবিষ্যতের ব্যাংকিং টেকনোলজি হিসাবে দেখছেন এবং কিছু প্রভাবশালী দেশের কয়েকটি ব্যাংক ইতোমধ্যে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এই প্রযুক্তির পেছনে। ব্লকচেইন সিস্টেম এবং সেটার জন্য প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন ডিজাইন ও ডেভেলপ করেন যিনি তার নাম সাতোশি নাকামোতো। 'যিনি' কথাটা এখানে সম্ভবত ঠিক নয়, কেননা সাতোশি নাকামতোর পরিচয় এখনও জানা যায়নি। এটা হতে পারো কোন ব্যাক্তি, গোষ্ঠি, প্রতিষ্ঠার বা কোম্পানির কোডনেম।

এতক্ষণ পর্যন্ত ঠিকই ছিলো। এখন নিশ্চইয় ভাবছেন এই ব্লকচেইন আবার কি! তাহলে চলুন ব্লক চেইন নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

ব্লকচেইন কি?
মোটামুটি নির্দিষ্ট একটি সময়ের মধ্যে সারা পৃথিবী জুড়ে যত অর্থের বা সম্পদের লেনদেন হচ্ছে সেই লেনদেনের সকল এনক্রিপটেড তথ্য একসাথে নিয়ে একটা ব্লক বানানো হয়। সেই ব্লক দিয়ে ক্রমানুসারে সাজানো সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয় একটা ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড লেজারকেই মূলত ব্লকচেইন বলা হয়। কেমন যেন ঘোলাটে লাগছে সব কিছু, তাইনা! বিটকয়েন কে আমরা এখন অনেকেই চিনি। এখানে আমরা যে ব্লক চেইনের কথা বলছি তার একটা উদাহরণ হচ্ছে বিটকয়েন ব্লকচেইন। বিটকয়েন একটা ক্রিপ্টোকারেন্সি যা কোন একটা ব্লকচেইন ব্যবহার করে পরিচালিত হয়।

ব্যাংকের যাবতীয় লেনদেন রেকর্ড করার জন্য সকল শাখায় একটা বড় সাইজের খাতা থাকে। আর যে ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে, তাদের এই রেকর্ড থাকে ডেটাবেইজে। হয়তো, সেই পুরানো খাতাতেও থাকে। এই বড় সাইজের খাতাটাকে বলে লেজার। তো একটা ভ্যালিড ট্রানকেজশানের জন্য অবশ্যই ব্যাংকের লেজারে সেটার এন্ট্রি থাকতে হবে। ব্লকচেইন এরকম একটা লেজার, যেখানে পাশাপাশি একটার পর একটা এরকম অনেকগুলো ব্লক থাকে। প্রত্যেকটা ব্লকের ভিতর থাকে একটা সময়ে মাঝে সারা পৃথিবীতে যত ট্রানজেকশান হয়েছে সেটার সকল ডেটা। এই ডেটা ওপেন কিন্তু এনক্রিপ্টেড অর্থাৎ সবাই দেখতে পারবে এই ডেটা কিন্তু পড়তে গেলে প্রাইভেট কী লাগবে। অর্থাৎ আপনি যদি এখানে ট্রাঞ্জেকশান করে থাকেন তাহলে শুধুমাত্র আপনি এখান থেকে আপনার ট্রানজেকশনের সকল তথ্য সেটার প্রাইভেট কী ব্যাবহার করে পড়তে পারবেন, অন্য কেউই পারবেনা। তবে মানুষ যেটা দেখবে তা হল ট্রানজেকশনের পরিমাণ। তবে কার অর্থ কার কাছে গিয়েছে সেটা এভাবে জানা যাবেনা। কেননা শুধুমাত্র এড্রেস দিয়ে চলে যাবে টাকা। কোন পরিচয় থাকবেনা।

নিচের ছবিতে দেখা যাবে একটা ট্রানজেকশান দেখতে কেমন। ব্লকচেইনের প্রত্যেকটা ব্লক সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয়। একবার চেইনে একটা ব্লক যোগ হয়ে গেলে সেটাতে কোন প্রকারের পরিবর্তন অসম্ভব। ব্লকগুলো পাশাপাশি তাদের সৃষ্টির ক্রমানুসারে বসে। প্রত্যেকটা ব্লক তার আগে কোন ব্লক আছ সেটা জানে। এভাবে একটা ব্লকের সাথে আরেকটা কানেক্টেড। ব্লকচেইন ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড সিস্টেম, অর্থাৎ সারা পৃথিবীতে বলতে গেলে একই ব্লকচেইনের সব ইউজার বা ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষ ইউজারদের কাছে একেবারে কার্বন কপি আছে। কাজেই একটা বা শ-খানেক সার্ভার বা কম্পিউটার একসাথে নস্ট হয়ে গেলেও ব্লকচেইনের কিছুই হবেনা।

ক্রিপটোকারেন্সিঃ
আমাদের প্রচলিত মুদ্রার মত ক্রিপ্টোকারেন্সি ও এক প্রকার মুদ্রা বা বিনিময় মাধ্যম। অর্থাৎ প্রচলিত মুদ্রা যেমন, ডলার, পাউন্ড, টাকা ইত্যাদি দিয়ে যে কাজ করা যায়, ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়েও সেই একই কাজ করা যায়। ব্লকচেইন টেকনোলজির মাধ্যমে লেনদেনের জন্য এই ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করা হয়। এইরকম মুদ্রা অনেক আছে, যেমন বিটকয়েন, বিটক্যাশ, মোনেরো, লাইটকয়েন ইত্যাদি। আমাদের মুদ্রা যেমন, ডলার, পাউণ্ড, টাকা ইত্যাদির দাম বিভিন্ন সময় ওঠানামা করে, এগুলোর ক্ষেত্রেও তাই, অর্থাৎ ক্রয়/বিক্রয় মূল্য ওঠানামা করে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি
ক্রিপ্টোকারেন্সি
তো এতক্ষণে নিশ্চইয় বুঝতে পেরেছেন ক্রিপ্টোকারেন্সি মানে কি। চলুন এবার তাহলে ক্রিপ্টোকারেন্সির কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

ক্রিপ্টোকারেন্সি ( যেমন ধরুন, বিটকয়েন) একটি নেটওয়ার্কের মতো। প্রতিটি পিয়ারের সমস্ত লেনদেনের সম্পূর্ণ ইতিহাস এবং এইভাবে প্রতিটি অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্সের রেকর্ড আছে। যেমন একটি ট্রান্সজেকশন ফাইল বলছে, "শামছুল x পরিমাণ বিটকয়েন অ্যালিস্কে দেয়" এবং এটি শামছুল হকের ব্যাক্তিগর কী দ্বারা সাক্ষরিত। এটি মৌলিক পাবলিক কী ক্রিপ্টোগ্রাফি। স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে একটি লেনদেন পুরো নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি এক পিয়ার থেকে অন্য পিয়ারে পাঠানো হয়। এটি মৌলিক P2P প্রযুক্তি। নিচের ইনফোগ্রাফ থেকে ধারণা পাওয়া যাবে কিভাবে ব্লকচেইন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি কাজ করে। ছবিটিতে ক্লিক করলে বড় আকারে দেখঅ যাবে।

Blockchain Infographic [www.pwc.com]
Blockchain Infographic [www.pwc.com]
লেনদেনটি অতি দ্রুত সম্পন্ন হয়। তবে নির্দিষ্ট সময় পরে নিশ্চিত হয়। অনেকটা কোন একাউন্ট অ্যাকটিভ করার মাধ্যমে কনফার্ম করার মতো। এই কনফার্ম বা নিশ্চিতকরণ ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যতক্ষণ লেনদেন অনিশ্চিত হয় ততক্ষণ, এটি মুলতুবি আছে এবং জাল করা হতে পারে। যখন একটি লেনদেন নিশ্চিত করা হয়, এটি পুরোপুরিভাবে লেজারে সেট করা হয়। এটিকে আর সংশোধন করা যাবেনা, মুছে ফেলা যাবে না। অর্থাৎ লেজারের তথ্য আর আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন না। এই প্রসেসটিই মূলত ব্লকচেইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা আগেই আলোচনা করা হয়েছে।
শুধুমাত্র মাইনাররা ট্রানজেকশন নিশ্চিত করতে পারবেন। মূলত ক্রিপ্টোকারেন্সি নেটওয়ার্কে এটিই মাইনারদের কাজ। তারা ট্রানজেকশন গ্রহন করে, লেজারে জমা রাখার পর নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে দেয়। যখনি মাইনার কর্তৃক ট্রানজেকশন নিশ্চিত করা হয়, তখনি সেটা অপরিবর্তনীয় ব্লকচেইনের অংশ হয়ে যায়। এই কাজের জন্য মাইনাররা ক্রিপ্টোকারেন্সির টোকেন (ফী বলা যায়) লাভ করে (যেমন: বিটকয়েন)। যেহেতু মাইনরদের কার্যকলাপ ক্রিপ্টোকুরেন্স-সিস্টেমের একক সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাই আমরা মাইনরদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবো।

প্রচলিত সকল মুদ্রার নিয়ন্ত্রক হল কোন দেশের সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারি হোক বা আমেরিকার মত প্রাইভেট হোক, দেশের অর্থনীতি এবং আরও অন্যান্য কিছু বিষয় বিবেচনা করে নতুন কারেন্সি তৈরি করতে পারে। সোজা বাংলায় নতুন 'ব্যাংক নোট' ছাপতে দিতে পারে। অর্থাৎ সেটা নিয়ন্ত্রকেরা নিজেদের ইচ্ছামত করতে পারে, কার লাভ কার ক্ষতি সেটা নিয়ে তাদের মাথা না ঘামালেও তাদের চলে অনেকসময়। যেমন, আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টাকা ছাপা হওয়ার কারনে আমাদের মুদ্রাস্ফীতি আছে।

কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে তৈরি হয়। এখানে নতুন কারেন্সি বা বিটকয়েন আসে প্রতি ১০ মিনিটে একটি ক্রিপ্টোগ্রাফিক পাজল সমাধান করার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। আর এই পাজল প্রতিযোগিতাই হয় মাইনারদের মাধ্যমে।

যারা এনক্রিপশান সম্পর্কে জানে, তাদের কাছে SHA256 এনক্রিপশান পরিচিত হওয়ার কথা। যারা পরিচিত না, এটুকু জানলেই হবে, যে কোন ডেটাকে SHA256 এ যদি এনক্রিপ্ট করা হয় তাহলে ওই ডেটার জন্য একটা হ্যাশ পাওয়া যায়। হ্যাশ হল বোঝার সুবিধার্থে, "000001beeca3785d515897041af0a7" এরকম কিছু একটা। এখন এই ডেটা থেকে যদি অতি সামান্য কোন কিছুও পরিবর্তন হয়, তাহলে একটি ভিন্ন হ্যাশ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ এভাবে এনক্রিপ্ট করলে নির্দিষ্ট একটা ডেটার জন্য হ্যাশ সর্বদা একই হবে, এবং সবার কম্পিউটারেই একই হবে।

এখন লক্ষ করি, উপরে যে হ্যাশটা আমি ব্যবহার করেছি ওখানে শুরুতে ৫টা জিরো আছে। এটা ইচ্ছাকৃত। এবং এটাই সেই ক্রিপটোগ্রাফিক পাজল যেটার কথা একটু আগে বলেছি। প্রতি মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে বিটকয়েনের ব্লকচেইনে অসংখ্য লেনদেন চলছে। ব্লকচেইনে নতুন একটা ব্লক যোগ হওয়ার পর থেকে আনুমানিক ১০ মিনিট ধরে পেন্ডিং ট্রানজেকশনের ডেটা বিটকয়েন সিস্টেমের সকল মাইনারদের কম্পিউটারে জমতে থাকে। তো কথা হচ্ছে মাইনার মানে আমরা নিজেরা এবং আমরা কম্পিউটার নিয়ে বসে আছি পাজল সমাধান করার জন্য।

এখন আমাদের বা মাইনারদের টার্গেট হল, যে ডেটা আমাদের কাছে এই মুহূর্তে আছে সেটা, আগের ব্লকের হ্যাশ এবং তার সাথে আরেকটা Random Number (এখানে একে Nonce = Number Used Once বলা হয়) মিলিয়ে উপরের মত শুরুতে ৫টা জিরো আছে এরকম প্যাটার্নের একটা হ্যাশ খুঁজে বের করা। এই ৫টা জিরো কেন? এটাকে বলা হয়, ডিফিকাল্টি লেভেল, অর্থাৎ শুরুতে কয়টা জিরো বসবে সেটা আসলে পাজলটা সমাধান করা কত কঠিন সেটা নির্দেশ করে।

এভাবে মুহূর্তের মধ্যে সারা পৃথিবীতে হাজার হাজার মাইনার তাদের কম্পিউটারে সেই কাঙ্ক্ষিত হ্যাশ খুঁজে বের করার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। এই প্রসেস আসলে কোন বিশেষ অ্যালগরিদম বা বুদ্ধি দিয়ে জেতা যাবেনা। একেবারে বাংলা পদ্ধতিতে একটার পর একটা Nonce বা এক্সপ্রেশন প্রয়োগ করে চেক করতে হবে সেই প্যাটার্নের হ্যাশ পাওয়া গেল কিনা।

এই প্রতিযোগিতায় যে মাইনার সবার আগে এই হ্যাশ খুঁজে বের করতে পারে যে জয়ী। হ্যাশ খুঁজে পাওয়া মানে হল, নতুন একটা ব্লকচেইনের জন্য নতুন একটা ব্লক তৈরি হওয়া। চমৎকার না? বাকি মাইনার যারা জিততে পারলোনা তাদের কাজ হল, বিজয়ী মাইনারের রেজাল্ট সঠিক কিনা সেটা ভেরিফাই করা। এভাবে সম্ভবত ৫১.৭% মাইনার ভেরিফাই করে দিলে তখন, নতুন ব্লকটা একটা পরীক্ষিত বা সঠিক ব্লক হিসাবে ব্লকচেইনে যোগ হয়ে যায়।

বিটকয়েন কিভাবে কাজ করে তার একটা ভিজুয়াল আইডিয়া নিচের ভিডিও থেকে পাওয়া যেতে পারে।


বাংলায় ব্লকচেইন নিয়ে যত লিখা আছে তার মাঝে মিডিয়ামের ব্লকচেইন এ ভবিষ্যৎ! লিখাটি সবচেয়ে বেশি সহজ এবং ভালো বলে মনে হয়েছে আমার। সকল তথ্য খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অবশ্যপাঠ্য!

ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে অনেক আলোচনা করা হলো।ক্রিপ্টোকারেন্সির অনেক ধরণের প্রকারভেদ আছে।যদি বিটকয়েন অধিক ব্যবহৃত ক্রিপ্টোকারেন্সি।এছাড়াও অনেক ধরণের ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে।

অন্যদিকে ক্রিপ্টোকারেন্সির সিকিউরিটি নিয়েও অনেকের সন্দেহ থাকতে পারে। বাকী সব ক্রিপ্টোকারেন্সি, ক্রিপ্টোকারেন্সির নিরাপত্তা এবং ভবিষৎ নিয়ে আগামী পর্বে আলোচনা করা হবে। সবাইকে সেই পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে আজকে এখানেই শেষ করছি।অনলাইনে লেনদেনে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা বিটকয়েন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার হয়ে আসছে বেশ কয়েক বছর থেকে এবং দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই ‘ক্রিপটোকারেন্সি’। বাংলাদেশেও সম্প্রতি এর লেনদেন শুরু হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বিটকয়েনের আইনি কোনো ভিত্তি নেই। আর ঝুঁকি এড়াতে এ দিয়ে লেনদেন কিংবা এর প্রসারে সহায়তা কিংবা প্রচার থেকে বিরত থাকতে সবাইকে অনুরোধ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার প্রচলন করে। এ ধরনের মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি নামে পরিচিতি পায়। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সে ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেওয়া হয় বিটকয়েন।এছাড়াও আছে ইথিরিয়াম, রিপেল, লাইটকয়েন। তবে সবার থেকে জনপ্রিয় বিটকয়েন।
কিন্তু বিটকয়েন কী? আর কীভাবেই বা কাজ করে বিটকয়েন? আসুন তা জেনে নেয়া যাক-

বিটকয়েন কী?
উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, বিটকয়েন হল এক ধরনের ‘মুদ্রা’ যা দিয়ে অনলাইনে লেনদেন করা যায়। এটিকে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ক্রিপটোগ্রাফিক কারেন্সি বলা হয়। মূলত এটি হল ওপেন সোর্স ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রোটকলের মাধ্যমে লেনদেন হওয়া সাংকেতিক মুদ্রা। বিটকয়েনের সবথেকে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এটি লেনদেনের জন্য কোন ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না। আর তাই প্রয়োজন হয় না কোন অনুমোদনেরও। আর ইন্টারনেটে লেনদেনকারীদের নিকট খুবই জনপ্রিয় বিটকয়েন।

ইতিহাস
অস্ট্রেলিয়ার এক কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ী সাতোশি নাকামোতো ২০০৮ সালে এই মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন করেন। তিনি এ মুদ্রা ব্যবস্থাকে পিয়ার-টু-পিয়ার লেনদেন নামে অভিহিত করেন।বিটকয়েনের লেনদেনটি বিটকয়েন মাইনার নামে একটি সার্ভার কর্তৃক সুরক্ষিত থাকে। পিয়ার-টু-পিয়ার যোগাযোগ ব্যাবস্থায় যুক্ত থাকা একাধিক কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মধ্যে বিটকয়েন লেনদেন হলে এর কেন্দ্রীয় সার্ভার ব্যবহারকারীর লেজার হালনাগাদ করে দেয়। একটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে নতুন বিটকয়েন উৎপন্ন হয়। ২১৪০ সাল পর্যন্ত নতুন সৃষ্ট বিটকয়েনগুলো প্রত্যেক চার বছর পরপর অর্ধেকে নেমে আসবে। ২১৪০ সালের পর ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন তৈরী হয়ে গেলে আর কোন নতুন বিটকয়েন তৈরী করা হবে।

কার্যপ্রণালী
বিটকয়েনের লেনদেন হয় পিয়ার টু পিয়ার বা গ্রাহক থেকে গ্রাহকের কম্পিউটারে। আগেই বলা হয়েছে এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান নেই। বিটকয়েনের সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অনলাইনে একটি উন্মুক্ত সোর্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে। বিটকয়েন মাইনারের মাধ্যমে যেকেউ বিটকয়েন উৎপন্ন করতে পারে। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় অনুমানযোগ্য এবং সীমিত। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার সাথে সাথে এটি গ্রাহকের ডিজিটাল ওয়ালেটে সংরক্ষিত থাকে। এই সংরক্ষিত বিটকয়েন যদি গ্রাহক কর্তৃক অন্য কারও একাউন্টে পাঠানো হয় তাহলে এই লেনদেনের জন্য একটি স্বতন্ত্র ইলেক্ট্রনিক সিগনেচার তৈরী হয়ে যায় যা অন্যান্য মাইনার কর্তৃক নিরীক্ষিত হয় এবং নেটওয়ার্কের মধ্যে গোপন অথচ সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত হয়। একই সাথে গ্রাহকদের বর্তমান লেজার কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে হালনাগাদ হয়। বিটকয়েন দিয়ে কোন পণ্য কেনা হলে তা বিক্রেতার একাউন্টে পাঠানো হয় এবং বিক্রেতা পরবর্তীতে সেই বিটকয়েন দিয়ে পুনরায় পণ্য কিনতে পারে, অপরদিকে সমান পরিমাণ বিটকয়েন ক্রেতার লেজার থেকে কমিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যেক চার বছর পর পর বিটকয়েনের মোট সংখ্যা পুনঃনির্ধারন করা হয় যাতে করে বাস্তব মুদ্রার সাথে সামঞ্জস্য রাখা যায়।

সুবিধা-অসুবিধা
অনলাইনে যারা লেনদেন করেন তাদের জন্য খুবই সুবিধাজনক বিটকয়েন। যাদের বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন করার মত সুযোগ নেই বা ক্রেডিট কার্ড নেই তাদের জন্যও ব্যাপক উপকারি এ বিটকয়েন। তবে কোন ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান না থাকা এবং এর কার্যক্রম তদারকি করার কোন সুযোগ না থাকায় অপরাধীদের কাছেও খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিটকয়েন। বৈধ লেনদেনের পাশাপাশি অবৈধ লেনদেনেও ব্যবহৃত হয় বিটকয়েন। জুয়া খেলা বা বাজি ধরা, অবৈধ পণ্য কেনা-বেচা ইত্যাদির লেনদেনে ব্যবহৃত হয় বিটকয়েন।মাদক চোরাচালান এবং অর্থপাচার কাজেও বিটকয়েনের ব্যবহার আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আলোচনা-সমালোচনা
সম্প্রতি কানাডার ভ্যানক্যুভারে বিটকয়েন এর প্রথম এটিএম মেশিন চালু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এটি বিটকয়েনকে আরও আগিয়ে নিয়ে যাবে। মাদক, চোরাচালান অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা ও অন্যান্য বেআইনি ব্যবহার ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডীয় সরকার বিটকয়েনের গ্রাহকদের নিবন্ধনের আওতায় আনার চিন্তাভাবনা করছে। অন্যদিকে অনেক দেশই অবস্থান নিচ্ছে বিটকয়েনের বিরুদ্ধে। দিও বিটকয়েন ডিজিটাল কারেন্সি হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিপরীতে এর দর মারাত্মক ওঠানামা, দুষ্প্রাপ্যতা এবং ব্যবসায় এর সীমিত ব্যবহারের কারণে অনেকেই এর সমালোচনা করেন।এখন যুগ ভার্চুয়াল মুদ্রা বা বিটকয়েনের। কিন্তু কি এই ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল মুদ্রা? ডিজিটাল মুদ্রার আদান-প্রদান হয় অনলাইনে। বিনিময়ের সব তথ্য গোপন থাকে, বেশির ভাগ সময়েই থাকে অজ্ঞাত। ধরুন, আপনার অর্থ আছে, কিন্তু পকেটে নেই। ব্যাংকে বা সিন্দুকেও সেই অর্থ রাখা হয়নি। রাখা হয়েছে ইন্টারনেটে। কোনো দিন ছুঁয়েও দেখতে পারবেন না অনলাইনে রাখা ওই অর্থ। শুধু ভার্চ্যুয়াল জগতের এ মুদ্রাকেই বলা হয় ডিজিটাল মুদ্রা বা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা।

ডিজিটাল মুদ্রার আদান-প্রদান হয় অনলাইনে। বিনিময়ের সব তথ্য গোপন থাকে, বেশির ভাগ সময়েই থাকে অজ্ঞাত। এ ধরনের ডিজিটাল মুদ্রাকে বলা হয় ক্রিপ্টোকারেন্সি। এ ধরনের মুদ্রার বিনিময়ে ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি নামের একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে প্রচলিত ভাষা বা সংকেতে লেখা তথ্য এমন একটি কোডে লেখা হয়, যা ভেঙে তথ্যের নাগাল পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতিতে ব্যবহারকারী ছাড়া অন্য কারও কোনো কেনাকাটা বা তহবিল স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া বেশ কঠিন।

এরপরও ডিজিটাল মুদ্রার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা ঘটে গেছে গত শুক্রবার। টোকিওভিত্তিক ডিজিটাল মুদ্রার বিনিময় প্রতিষ্ঠান কয়েনচেকের কম্পিউটার ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক হ্যাক করে মোট ৫৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার মূল্যমানের ডিজিটাল মুদ্রা খোয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২ লাখ ৬০ হাজার গ্রাহক। তবে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের খোয়া যাওয়া অর্থের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার আশ্বাস জানিয়েছে কয়েনচেক। হ্যাকিংয়ে অর্থ চুরির ঘটনায় নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা নিয়ে তোপের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোপনে ও নিরাপদে যোগাযোগের জন্য ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছিল। গাণিতিক তত্ত্ব ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিপ্টোগ্রাফিরও উন্নতি হয়েছে। এতে অনলাইনে ডিজিটাল মুদ্রা সংরক্ষণ ও আদান-প্রদানের বিষয়টি আরও নিরাপদ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

অবশ্য এত নিরাপত্তা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে ডিজিটাল মুদ্রার বিভিন্ন বিনিময় প্রতিষ্ঠানে বেশ কটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল মুদ্রা হিসেবে বিটকয়েনের আবির্ভাব ঘটে। বর্তমানে ইন্টারনেটে এক হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে। কয়েনচেক থেকে চুরি হয়েছে স্বল্প পরিচিত মুদ্রা এনইএম। গত বছরের ডিসেম্বরে নাইসহ্যাশ নামের স্লোভেনিয়ার একটি কোম্পানির মাত কোটি ডলারের বিটকয়েন চুরি হয়। বিটকয়েন চুরির ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালেও। এরও আগে ২০১৪ সালে মুদ্রা চুরির শিকার হয়েছিল আরেক বিনিময় প্রতিষ্ঠান এমটিগক্স। তাদের নেটওয়ার্ক থেকে ৪০ কোটি ডলার চুরি গিয়েছিল। চুরির ঘটনা স্বীকার করার পর ওই প্রতিষ্ঠান শেষে বন্ধই হয়ে যায়।

ডিজিটাল মুদ্রা কোনগুলো?
বিশ্বে এখন হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু আছে। তবে বিনিময় মূল্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে নিচের ডিজিটাল মুদ্রাগুলো:

বিটকয়েন: এখন পর্যন্ত চালু থাকা ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিটকয়েন। এর বিনিময় মূল্যও সবচেয়ে বেশি। সাতোশি নাকামোতো ২০০৯ সালে বিটকয়েন তৈরি করেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বিটকয়েনের বাজার পুঁজির পরিমাণ ছিলে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার। কিছুদিন আগে একটি বিটকয়েনের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২০ হাজার ডলার। তবে চলতি বছরে বিনিময় মূল্যের এই হার প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায়।

এথেরিয়াম: ২০১৫ সালে তৈরি হয় এথেরিয়াম। বিটকয়েনের মতো এই মুদ্রারও নিজস্ব হিসাবব্যবস্থা আছে। বিনিময় মূল্যের দিক থেকে এটি দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে বিটকয়েনের পরই আছে এথেরিয়াম। গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার বাজারে পুঁজির পরিমাণ প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০১৬ সালে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর এটি দুটি মুদ্রায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এর বিনিময় মূল্য ৮৪০ ডলারে পৌঁছেছিল। তবে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর প্রতিটি এথেরিয়াম মুদ্রা ১০ সেন্টে বিক্রির ঘটনাও ঘটেছিল।

রিপল: ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রিপল। শুধু ক্রিপ্টোকারেন্সি নয়, অন্যান্য ধরনের লেনদেনও করা যায় এই ব্যবস্থায়। প্রচলিত ধারার বিভিন্ন ব্যাংকও এই ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করছে। বাজারে ১০ বিলিয়ন ডলারের পুঁজি আছে রিপলের।

লাইটকয়েন: বিটকয়েনের সঙ্গে বেজায় মিল আছে লাইটকয়েনের। তবে বিটকয়েনের চেয়ে দ্রুত লেনদেন করা যায় লাইটকয়েনে। এর বাজার মূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার।

‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা-পদ্ধতিতে প্রতিটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্লকচেইন’ নামের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। ছবি: রয়টার্স
‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা-পদ্ধতিতে প্রতিটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্লকচেইন’ নামের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। ছবি: রয়টার্স

কীভাবে কাজ করে ডিজিটাল মুদ্রা?
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিপ্টোকারেন্সি একধরনের বিকেন্দ্রীকৃত প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইনে নিরাপদে অর্থ পরিশোধ করা যায়। আমানতকারীর নাম গোপন রেখে এবং ব্যাংকে না গিয়েই অর্থ জমা রাখা যায়।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থার মতো সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল মুদ্রা ছাপায় না। ‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা পদ্ধতিতে একেকটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত এক বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘ব্লকচেইন’। এই ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ লেনদেনসহ বন্ড, স্টক ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদের কেনাকাটাও করা যায়।

ব্যবহারকারীরা অনলাইনে ব্রোকারদের কাছ থেকেও বিভিন্ন ডিজিটাল মুদ্রা কিনতে পারেন। অনলাইনে ‘ক্রিপ্টোগ্রাফিক ওয়ালেট’ নামক নিরাপদ স্থানে রাখা যায় এই মুদ্রা।

নির্দিষ্ট ডিজিটাল মুদ্রা যত বেশি মানুষ কেনে, সেই মুদ্রার বাজার দর তত বাড়ে। এভাবেই শেয়ার বাজারের মতো নিয়মিত ওঠানামা করে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময় মূল্য। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবহারকারী পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন থাকে বলে অনেক সময় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার বেশি দেখা যায়।

বিশ্বে এখন হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু রয়েছে। তবে বিনিময় মূল্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বিটকয়েন।

কেন ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোকারেন্সি?
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচয় গোপন ও লেনদেন ব্যবস্থায় কঠোর নিরাপত্তা—এই দুটি বিষয়ই হলো ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রাব্যবস্থায় আকৃষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ। এই ব্যবস্থায় একবার লেনদেন হওয়ার পর তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। একই সঙ্গে লেনদেনের খরচ কম হওয়ায় এটি গ্রাহকদের কাছে বেশি নির্ভরযোগ্যতা অর্জন করেছে। এর প্রযুক্তিব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকৃত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, সবার হাতের কাছেই থাকে ডিজিটাল মুদ্রা। যেখানে প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থায় ব্যাংক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্ট না খুললে সেবা পান না কোনো গ্রাহক।

ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে আকৃষ্ট হওয়ার আরেকটি কারণ হলো এতে কম বিনিয়োগ করেই ব্যাপক লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ, প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থার তুলনায় ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর বিনিময় মূল্যের ওঠা-নামা বেশি। তাই রাতারাতি ধনী হওয়ার সুযোগও থাকে। ঠিক এই কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিটকয়েন বা অন্যান্য শীর্ষ ডিজিটাল মুদ্রায় বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে।

তবে এর কিন্তু উল্টো দিকও আছে। অর্থাৎ দর বেড়ে গেলে যেমন ধনী হওয়ার সুযোগ আছে, তেমনি হুট করে দর নেমে গেলে রাস্তাতেও নামতে পারেন। আবার কঠোর গোপনীয়তা থাকায় অবৈধ কর্মকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট লেনদেনে পছন্দের শীর্ষে আছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। তাই বিনিয়োগকারীদের এসব বিষয়ে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে।বর্তমানে ফেসবুক কিংবা ইউটিউবের কল্যাণে আমাদের সবাই হয়তো কখনো না কখনো বিটকয়েন শব্দটি শুনেছি। কিন্তু বিটকয়েন সম্পর্কে বিস্তারিত আমরা অনেকেই ভালোভাবে জানি না। বিটকয়েন কী? কীভাবে কাজ করে? কী কী কাজে ব্যবহার করা হয়? চলুন জেনে নেয়া যাক এসব প্রশ্নের উত্তর।

বিটকয়েন কী?
বিটকয়েন হলো একধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি। আর ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো এমন একধরনের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থা যার কোনো ফিজিক্যাল বা বাস্তব রূপ নেই। বিটকয়েন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি।



বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো বিটকয়েন; Source: crypto-news.net

সাধারণত আমরা টাকা-পয়সা লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি তৃতীয় পক্ষীয় সংস্থার আশ্রয় নেই। যেমন মনে করুন, আপনি আপনার বন্ধুকে কিছু টাকা পাঠাবেন। এক্ষেত্রে আপনি আপনার ফোনের বিকাশ/রকেট একাউন্ট থেকে আপনার বন্ধুকে টাকাটি পাঠিয়ে দিলেন। এখানে আপনি প্রেরক, আপনার বন্ধু প্রাপক এবং বিকাশ/রকেট তৃতীয় পক্ষ, যে কিনা সমস্ত লেনদেন প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করলো এবং এর জন্য কিছু চার্জ আদায় করলো।

কিন্তু বিটকয়েন এমন একটি মুদ্রা ব্যবস্থা যাতে অর্থ আদান-প্রদানের জন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হয় না। প্রেরকের কাছ থেকে সরাসরি বিটকয়েন প্রাপকের কাছে পৌছে যায়। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘পিয়ার টু পিয়ার’ (peer-to-peer)। এক্ষেত্রে সমস্ত লেনদেন প্রক্রিয়াটি হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করে যা অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি প্রক্রিয়া। যেহেতু কোনো তৃতীয় পক্ষীয় সংস্থা এই লেনদেন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে না, সেহেতু বিটকয়েনের লেনদেনের গতিবিধি নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। অর্থাৎ কে কাকে বিটকয়েন পাঠাচ্ছে তার পরিচয় কেউ জানতে পারে না। পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখেই বিটকয়েন লেনদেন করা যায়।

যেভাবে এলো এই বিটকয়েন
২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট। এই দিনে ইন্টারনেট জগতে ‘bitcoin.com’ নামের একটি ওয়েবসাইটের ডোমেইন রেজিস্টার করা হয়। এ বছরেরই নভেম্বর মাসে ‘সাতোশি নাকামোতো’ ছদ্মনামে এক ব্যক্তি বা একটি দল ‘Bitcoin: A Peer-to-Peer Electronic Cash System’ নামে একটি গবেষণাপত্র অনলাইনে প্রকাশ করেন। এই গবেষণাপত্রটিতেই সর্বপ্রথম বিটকয়েন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে সাতোশি নাকামোতো বিটকয়েন তৈরি করার সফটওয়্যারের কোড অনলাইনে রিলিজ করেন। তৈরি হয় বিটকয়েন ‘মাইনিং’ এর সফটওয়্যার। বিটকয়েন মাইনিং হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বিটকয়েন তৈরি করা হয়। ২০০৯ সালের এই জানুয়ারি মাসেই সাতোশি বিশ্বের প্রথম বিটকয়েন তৈরি করেন।


কে এই সাতোশি নাকামোতো তা কেউ জানে না; Source: coindesk.com

বহু বার বহুজনকে সাতোশি নাকামোতো সন্দেহে গ্রেফতার করা হলেও প্রকৃত সাতোশি নাকামোতো কে, বা এই নামের পেছনে কে বা কারা আছে তা আজও জানা যায়নি।

যেভাবে কাজ করে বিটকয়েন
সাধারণ মুদ্রার মতো বিটকয়েন আপনি হাতে নিয়ে লেনদেন করতে পারবেন না। কোনো ব্যাংক কিংবা প্রতিষ্ঠান এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার কারণে বিটকয়েন প্রেরক থেকে সরাসরি প্রাপকের ‘ওয়ালেটে’ চলে যায়। ওয়ালেট হচ্ছে আপনার মানিব্যাগের মতো, যেখানে আপনার নিজের বিটকয়েন জমা থাকে। ওয়ালেট অনলাইন কিংবা অফলাইন দু’ধরনেরই হয়। অনলাইন ওয়ালেট ব্যবহারকারী তার স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটারের মাধ্যমে ব্যবহার করতে পারে।


স্মার্টফোনের মাধ্যমেই ব্যবহার করা যায় ডিজিটাল ওয়ালেট; Source: letstalkpayments.com

প্রতিটি ওয়ালেটের একটি নির্দিষ্ট এড্রেস বা ঠিকানা থাকে। ঠিকানাটি সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড হয় বলে এটি মনে রাখা অসম্ভব। বিটকয়েন লেনদেনের জন্য ব্যবহারকারী তার এই ঠিকানাটি ব্যবহার করে থাকেন।


ব্লকচেইনে জমা থাকে সব লেনদেনের হিসাব; Source: idmmag.com

এক এড্রেস থেকে অন্য এড্রেসে বিটকয়েন পাঠালে তা সাথে সাথে একটি উন্মুক্ত খতিয়ানে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়, যার নাম ‘ব্লকচেইন’। এটি এমনই বিশাল একটি খতিয়ান ব্যবস্থা যাতে এযাবতকালে যত বিটকয়েন লেনদেন হয়েছে তার সবগুলোরই রেকর্ড রয়েছে। প্রতিটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে নেটওয়ার্কে একটি নতুন বিট কয়েন তৈরি হয়। পদ্ধতিকেই বলা হয় বিটকয়েন মাইনিং।

যেভাবে করা হয় বিটকয়েন মাইনিং
বিটকয়েন মাইনিং একটি জটিল প্রক্রিয়া। একটি নির্দিষ্ট মাইনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হয়। এজন্য প্রয়োজন হয় উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কম্পিউটার। কম্পিউটারের সিপিইউ এবং জিপিইউ ব্যবহার করে জটিল কিছু গাণিতিক এলগরিদমের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।


একটি বিটকয়েন মাইনিং রিগ; Source: youtube.com

প্রতিটি বিটকয়েন লেনদেন করা হলে তা ব্লকচেইনে লিপিবদ্ধ হয়। এ সময় বিটকয়েন মাইনাররা মাইনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের বৈধতা নির্ণয় করেন। আর এ সময়ই একটি নতুন বিটকয়েন তৈরি হয়।

বিটকয়েন লেনদেন ও নতুন বিটকয়েন তৈরির এই সমস্ত প্রক্রিয়াটিই ঘটে অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে। ফলে এতে কোনো ধরনের ছলচাতুরী কিংবা প্রতারণার সম্ভবনা থাকে না। উভয় পক্ষেরই পরিচয় থাকে গোপন।

বিটকয়েনের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য
বিটকয়েন একটি সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীভূত মুদ্রা ব্যবস্থা। সরকার কিংবা কোনো কর্তৃপক্ষ এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার ফলে এখানে প্রত্যেক ব্যবহারকারী তাদের বিটকয়েনের প্রকৃত মালিক। অন্য কেউ তাদের বিটকয়েন নেটওয়ার্কের মালিকানা নিতে পারে না।
বিটকয়েন লেনদেনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিই হয় নাম বিহীনভাবে। একজন বিটকয়েন ব্যবহারকারী একাধিক বিটকয়েন একাউন্ট খুলতে পারে। এসব একাউন্ট খোলার জন্য কোনো ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন ব্যবহারকারীর নাম, ঠিকানা ইত্যাদি প্রয়োজন হয় না। ফলে ব্যবহারকারীর প্রকৃত পরিচয় থাকে গোপন।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে। প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড ব্লকচেইনে জমা থাকে যা যে কেউ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে যখন তখন দেখতে সক্ষম। ফলে এখানে কোনো দুর্নীতির সুযোগ নেই।
বিটকয়েন একাউন্ট খোলা খুবই সহজ। এক্ষেত্রে সাধারণ ব্যাংক একাউন্ট খোলার মতো কোনো ঝামেলাযুক্ত ফর্ম পূরণ করতে হয় না। কোন এক্সট্রা ফি-ও প্রয়োজন হয় না। কোনো কাগজপত্রও জমা দেওয়া লাগে না।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া খুবই দ্রুত। পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই বিটকয়েন পাঠানো হোক না কেন তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাপকের কাছে পৌঁছে যাবে।
বিটকয়েনের কিছু অসুবিধা
বিটকয়েন সম্পূর্ণ অফেরতযোগ্য। অর্থাৎ কেউ ভুল করে কোনো ভুল ঠিকানায় বিটকয়েন পাঠিয়ে দিলে তা আর ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে না। প্রেরক-প্রাপক উভয়ের পরিচয়ই সম্পূর্ণ গোপন থাকে। ফলে অনেক অপরাধমূলক কাজে বিটকয়েন ব্যবহার করা সম্ভব। অবৈধ পণ্যের কেনা বেচাতেও বিটকয়েন ব্যবহৃত হয়। ইন্টারনেটের গোপন অংশ ডার্ক ওয়েবের সমস্ত লেনদেন হয় বিটকয়েনের মাধ্যমে।
বিটকয়েনের মূল্য অনেকটাই অস্থিতিশীল। কখনো বিশাল পরিমাণে বাড়ে তো কখনো বিশাল ধস নামে।
বর্তমান বিশ্বে বিটকয়েনের মূল্য ও বাংলাদেশে এর অবস্থা
বিটকয়েন প্রথম চালু হওয়ার পর থেকে দিন দিন এর মূল্য বেড়েই চলেছে। ২০১১ সালে বিটকয়েনের বাজারমূল্য সর্বপ্রথম ০.৩০ ডলার থেকে ৩২ ডলারে উঠে। এরপর ২০১৩ সালে এর দাম উঠে যায় ২৬৬ ডলারে। এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বিটকয়েনের দাম। ২০১৬ সালের শেষের দিকে এই দাম চলে আসে ৬০০ ডলারের উপরে। এরপর ২০১৭ সালে বিটকয়েনের দাম বেড়ে যায় রেকর্ড পরিমাণ। প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার করে বাড়তে বাড়তে এ বছরের নভেম্বরে বিটকয়েনের দাম উঠে যায় ৯,০০০ ডলারের কাছাকাছি। আর এই ডিসেম্বর মাসেই এই দাম বেড়ে পরিণত হয় ১৫,০০০ ডলারেরও বেশিতে যা সত্যিই অভূতপূর্ব একটি ঘটনা।


বিটকয়েনের দাম বেড়েছে ব্যাপক হারে; Source: coindesk.com

বিশ্বের বহু দেশে বিটকয়েন অনেক জনপ্রিয়। ওয়ার্ডপ্রেস, মাইক্রোসফট, উইকিপিডিয়া, ওভারস্টকের মতো বিশ্বের প্রায় ত্রিশ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান বিটকয়েন গ্রহণ করে। দিন দিন এর জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বাড়ছে। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস পর্যন্ত বিটকয়েন নিয়ে মন্তব্য করছেন, “Bitcoin is better than currency“।

এখন চলুন দেখি বাংলাদেশে বিটকয়েনের অবস্থান নিয়ে। বাংলাদেশ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসাবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনে অন্তর্ভুক্ত হয় ২০১৪ সালের ১৫ আগস্টে। কিন্তু বিটকয়েন ফাউন্ডেশনে যুক্ত হওয়ার ঠিক এক মাসের মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় বিটকয়েনের সকল লেনদেনের উপর। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দেশে বিটকয়েনের সকল প্রকার লেনদেন থেকে জনগণকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানায়। অর্থাৎ বিটকয়েন লেনদেনকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশে বিটকয়েনের উপর এই নিষেধাজ্ঞা বজায় রয়েছে।ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ (bitcoin) এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। গত ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনের সদস্যপদ পেয়েছে।

ঢাকা: ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ (bitcoin) এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। গত ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনের সদস্যপদ পেয়েছে। কিন্তু বিটকয়েন কি, কিসের জন্য? কি কাজে প্রয়োজন? এরকম নানাবিধ প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে বাংলানিউজ তার পাঠকদের জন্য নিয়ে এসেছে বিটকয়েন-এর উপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন। প্রথম পর্বে থাকছে ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ পরিচিতি।

সাধারণত কাগজের তৈরি প্রচলিত মুদ্রা বা এ সংশ্লিষ্ট কোন ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্বলিত বস্তু ব্যবহার করে বাস্তব জীবনে এবং অনলাইনে লেনদেন সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো আপাতঃ দৃষ্টিতে কোন প্রকারের সমস্যা ছাড়াই মিটিয়ে ফেলা যায়। তবে বর্তমানে ব্যবহৃত এটিএম কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড অথবা অন্য ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্বলিত বস্তুগুলো ব্যবহারে দুটি বড় সমস্যা রয়েছে।

এসবে লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহক ও গ্রহিতা উভয়কে তৃতীয় কোন পক্ষের উপর ‘ট্রাস্ট’ বা আস্থা রাখতে হয়, উদাহরণস্বরূপ ব্যাংক। তৃতীয় পক্ষ এই ব্যাংকে উভয় পক্ষ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের মুদ্রা পরিশোধ করে, যেটিকে ইংরেজীতে বলে ‘ডাবল স্পেন্ডিং’।ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা ইথিরিয়াম জনপ্রিয় হচ্ছে। বিটকয়েনের পরেই রয়েছে এ মুদ্রা। বিটকয়েনের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই? প্রযুক্তি দুনিয়ায় হইচই তোলা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা বিটকয়েন। অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার প্রচলন করে। এ ধরনের মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি নামে পরিচিতি পায়। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সে ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেওয়া হয় বিটকয়েন।

ক্রিপ্টোকারেন্সির দুনিয়ায় বাজার দখলের দিক থেকে বিটকয়েনের পরের অবস্থানে আছে ইথিরিয়াম। ২০১৩ সালে ভিটালিক বুটকারিন প্রতিষ্ঠিত এ ভার্চ্যুয়াল মুদ্রায় ইথার নামের একটি ক্রিপটোকারেন্সি ব্যবহৃত হয়। অর্থ পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে ও মুদ্রা ব্যবহৃত হয়।

ইথিরিয়াম কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। এ মুদ্রা দিয়ে বিনিয়োগ, বিভিন্ন চুক্তিসহ নানা কাজ করা হয়। ইথিরিয়াম সাধারণত ‘স্মার্ট কনট্রাক্টসে’ ব্যবহৃত হয়। এ স্মার্ট কনট্রাক্টস হচ্ছে লেনদেনের প্রোটোকল বা প্রোগ্রাম যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই চুক্তির শর্ত পূরণ করে।

২০১৬ সাল থেকে এ মুদ্রা দিয়ে লেনদেন হয় এবং বর্তমানে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা জগতে ২৭ শতাংশ দখল করে রেখেছে। ডয়চে ব্যাংক ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের এক প্রতিবেদনে অনুযায়ী, প্রতি বছর এক কোটি ৮০ লাখ ইথারের বেশি অনুমোদন করা হয় না। ইথারের অনুমোদন সীমিত হওয়ায় প্রতিবছর এর চাহিদা বাড়ছে এবং আপেক্ষিক মুদ্রাস্ফীতি হার কম থাকে। এটি মূলত ইথহ্যাস মাইনিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে।

দ্য বিটকয়েন বিগ ব্যাং নামের বইয়ের লেখক ব্রায়ান কেলি লিখেছেন, ইথিরিয়ামের লক্ষ্য হচ্ছে কোনো ডেভেলপারের জন্য স্মার্ট কন্ট্রাক্ট লেখা সহজ করা বা ইথিরিয়াম ব্লকচেইনে চলবে। এ প্রযুক্তির প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না।
ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে আলোচনার আগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সচরাচর ব্যবহৃত মুদ্রাব্যবস্থা নিয়ে একটু জেনে নেয়া যাকঃ

বহু বছর আগে থেকেই মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী জিনিসপত্র লেনদেন করে আসছে। লেনদেনের সবচেয়ে প্রাচীন এবং অধিক প্রচলিত প্রথার মধ্যে অন্যতম ছিলো বিনিময় প্রথা। কিন্তু মানদন্ডের বিচারে সেখানে বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছেন। ধরা যাক, ফল ব্যবসায়ী শফিক সাহেবের একবস্তা চাল লাগবে এবং বিনিময়ে তাকে এক বস্তা তুলা দিতে হবে। কিন্তু শফিক সাহেবের কাছে কোন তুলা নেই। যেহেতু শফিক সাহেবের কাছে কোন তুলা নেই, তাহলে এখানে বিনিময় কার্য সম্পন্ন হতে পারছেনা।

বিনিময় প্রথার এই সমস্যা থেকে নিস্তার পাওয়ার লক্ষ্যে সবাই এমন একটা প্রথা উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো, যেখানে সব ধরণের পণ্যের একটা আদর্শ মূল্য থাকবে। উদাহরণ হিসেবে গোল্ডের কথা বলা যেতে পারে। অনেক বছর আগে থেকে এখনো গোল্ডকে সম্পদ পরিমাপের একটা একক হিসাবে ধরা হত। আগে সরাসরি গোল্ড লেনদেন হত, সেটা একসময় মানুষের প্রয়োজনমত কাগজের মুদ্রা ব্যাবস্থায় রূপ নেয়।

এভাবে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রা যেমন, টাকা, ডলার, পাউণ্ড, ইউরো ইত্যাদি এসেছে। দেশের অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই মুদ্রা ছেপে বাজারে ছাড়তে পারে মানুষের ব্যবহারের জন্য। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন বা সম্পদ আদান প্রদান সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো দেশের আইন অনুযায়ী সামলানোর জন্য তৈরি হয়েছে ব্যাংক বা ব্যাংকিং সিস্টেম। কিন্তু এতে করেও সমস্যার সমাধান হয়নি। পৃথিবীর ইতিহাসে বড় বড় ব্যাংক ডাকাতির ভয়াবহ গল্পগুলো শুনলে কার না হৃদয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়! তবুও সময় বয়ে যায়, আর মানুষ ও দমে যাবার পাত্র নয়। নিজের প্রয়োজনে তারা আবিষ্কার করে একের পর এক বিস্ময়। আজকে আমরা তেমনি এক বিস্ময়ের কথা বলবো।

বর্তমানে প্রচলিত নানান মূদ্রা
বর্তমানে প্রচলিত নানান মূদ্রা
মূল আলোচনায় যাবার আগে আমরা একটা কাল্পনিক দৃশ্যপট কল্পনা করার চেষ্টা করবো।

খুব ছোটবেলা থেকে আপনার অনেক ধরণের শখ আছে। এর মধ্যে অন্যতম শখ হচ্ছে আর্ট এন্ড কালচার। অর্থাৎ এই আধুনিকায়ন সভ্যতায় বসে আপনার দুষ্প্রাপ্য চিত্রকর্মের প্রতি বিশেষ আগ্রহ আছে। খুব ছোটবেলা থেকে সংগ্রহ করছেন। তাই নিজের এত বছরে সংগ্রহ করা চিত্রকর্ম নিয়ে আপনার ছোটখাটো একটা মিউজিয়াম আছে। কথায় আছে শখের তোলা ৮০, এর জন্য মূল্য ও দিতে হয় অনেক। এসব জিনিস সংগ্রহ করা এবং নিজের সংগ্রহে রাখা দুইটারই ঝামেলা অনেক। কারন এসবের উপর নানা ধরনের লোকজনের নজর থাকে, অনেক সময় এগুলো নিয়ে বড় ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধ কিংবা দুর্ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় শেষের দিকে অথবা চাকরি নিয়ে বেশ ব্যস্ত কিংবা এখন আর আগের মতো পেইন নিতে চান না, আবার শখের জিনিষ ছাড়তে ও চান না। তাই বেশ কিছুদিন ধরে ভাবছেন এমন কোন উপায় নিয়ে যা দিয়ে সংগ্রহের সকল আর্টগুলো এমনভাবে সংরক্ষণ করা যায় যেন,

প্রথমেই পণ্যের গুণগত মান নিশ্চায়ন করা।
আর্থিক লেনদেন এবং আইনগত ব্যাপারগুলো বাড়িতে বসে, বিনা ঝামেলায়, নীরবে এবং স্বল্পতম সময়ে করে ফেলা।
বিক্রয় করার সময় একটি স্বচ্ছ লেনদেন প্রক্রিয়া।
পণ্যের কঠোর নিরাপত্তা।
অর্থাৎ যদি কোন চোর কোনক্রমে আপনার কোন আর্ট চুরি করে বাইরে বিক্রি করতে যায়, তাহলে যেন সে চোরাই জিনিস বিক্রির দায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং চোর যদি পালিয়েও যায়, যে সেটা কিনেছে সে ধরা পড়ে চোরাই জিনিস কেনার অপরাধে।

বিনিময় প্রথা তো আর আপনার এই চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থা চাইলেই আপনার এই সমস্যা দূর করতে পারে। কিন্তু ঐ যে বললাম বড় বড় ব্যাংক ডাকাতির করুণ ইতিহাসের কথা। অন্যদিকে আপনি যে ধরণের আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যাংকগুলো এই মুহূর্তে দিতে পারছে না।

আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি সেই সাপেক্ষে ব্যাংকের ভূমিকা একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করি।

আপাতত আমরা এখানে ব্যাংকের গুরুত্ব বুঝানোর চেষ্টা করি। ধরে নিচ্ছি, আপনি আপনার চিত্রকলা সম্পর্কিত কোন কাজের জন্য মিসরের কোন এক পত্নতাত্ত্বিক ব্যবসায়ীর কাছে টাকা পাঠাবেন। তো আপনি জানেন কিংবা শুনেছেন যে প্রায় সময় তারা টাকা নিয়ে অনেক ধরণের অনৈতিক পথের আশ্রয় নেয়। তাই আপনি তাদের টাকা দিতে ঠিক ভরসা পাচ্ছেন না। যদি টাকা নিয়ে সে ব্যবসায়ী অস্বীকার করে! সুতরাং এক্ষেত্রে আপনার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান লাগবে যেখানে আপনি স্বাচ্ছন্দে টাকা আদান-প্রদান করতে পারবেন। অর্থাৎ আপনার অ্যাকাউন্টের টাকা আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিসরের সেই ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে যাবে, এবং প্রতিষ্ঠানটি সেই লেনদেনের রেকর্ড রাখবে যাতে এই লেনদেন নিয়ে দুইজনের কেউ কোন প্রশ্ন না তুলতে পারে। এই মাঝখানের প্রতিষ্ঠানটি হল ব্যাংক।

কেমন হতো যদি আপনি তৃতীয় কোন পক্ষ কিংবা ব্যাংকের আশ্রয় না নিয়ে কোন উপায়ে মিসরের সেই ব্যবসায়ীকে টাকা দিতে পারতেন? এখানে আমরা মূলত একটি প্রসেস নিয়ে চিন্তা করছি যা একটি ব্যাংকের চাইতে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে কোন অর্থ লেনদেন নিশ্চিত করবে। এমনকি সেই সিস্টেমে থাকবে না হ্যাংকি কিংবা কোন ধরণের লুটপাটের সম্ভাবনা।

আসলে এই প্রযুক্তির নাম হল ব্লকচেইন, যাকে বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তিবিদ ভবিষ্যতের ব্যাংকিং টেকনোলজি হিসাবে দেখছেন এবং কিছু প্রভাবশালী দেশের কয়েকটি ব্যাংক ইতোমধ্যে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এই প্রযুক্তির পেছনে। ব্লকচেইন সিস্টেম এবং সেটার জন্য প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন ডিজাইন ও ডেভেলপ করেন যিনি তার নাম সাতোশি নাকামোতো। 'যিনি' কথাটা এখানে সম্ভবত ঠিক নয়, কেননা সাতোশি নাকামতোর পরিচয় এখনও জানা যায়নি। এটা হতে পারো কোন ব্যাক্তি, গোষ্ঠি, প্রতিষ্ঠার বা কোম্পানির কোডনেম।

এতক্ষণ পর্যন্ত ঠিকই ছিলো। এখন নিশ্চইয় ভাবছেন এই ব্লকচেইন আবার কি! তাহলে চলুন ব্লক চেইন নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

ব্লকচেইন কি?
মোটামুটি নির্দিষ্ট একটি সময়ের মধ্যে সারা পৃথিবী জুড়ে যত অর্থের বা সম্পদের লেনদেন হচ্ছে সেই লেনদেনের সকল এনক্রিপটেড তথ্য একসাথে নিয়ে একটা ব্লক বানানো হয়। সেই ব্লক দিয়ে ক্রমানুসারে সাজানো সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয় একটা ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড লেজারকেই মূলত ব্লকচেইন বলা হয়। কেমন যেন ঘোলাটে লাগছে সব কিছু, তাইনা! বিটকয়েন কে আমরা এখন অনেকেই চিনি। এখানে আমরা যে ব্লক চেইনের কথা বলছি তার একটা উদাহরণ হচ্ছে বিটকয়েন ব্লকচেইন। বিটকয়েন একটা ক্রিপ্টোকারেন্সি যা কোন একটা ব্লকচেইন ব্যবহার করে পরিচালিত হয়।

ব্যাংকের যাবতীয় লেনদেন রেকর্ড করার জন্য সকল শাখায় একটা বড় সাইজের খাতা থাকে। আর যে ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে, তাদের এই রেকর্ড থাকে ডেটাবেইজে। হয়তো, সেই পুরানো খাতাতেও থাকে। এই বড় সাইজের খাতাটাকে বলে লেজার। তো একটা ভ্যালিড ট্রানকেজশানের জন্য অবশ্যই ব্যাংকের লেজারে সেটার এন্ট্রি থাকতে হবে। ব্লকচেইন এরকম একটা লেজার, যেখানে পাশাপাশি একটার পর একটা এরকম অনেকগুলো ব্লক থাকে। প্রত্যেকটা ব্লকের ভিতর থাকে একটা সময়ে মাঝে সারা পৃথিবীতে যত ট্রানজেকশান হয়েছে সেটার সকল ডেটা। এই ডেটা ওপেন কিন্তু এনক্রিপ্টেড অর্থাৎ সবাই দেখতে পারবে এই ডেটা কিন্তু পড়তে গেলে প্রাইভেট কী লাগবে। অর্থাৎ আপনি যদি এখানে ট্রাঞ্জেকশান করে থাকেন তাহলে শুধুমাত্র আপনি এখান থেকে আপনার ট্রানজেকশনের সকল তথ্য সেটার প্রাইভেট কী ব্যাবহার করে পড়তে পারবেন, অন্য কেউই পারবেনা। তবে মানুষ যেটা দেখবে তা হল ট্রানজেকশনের পরিমাণ। তবে কার অর্থ কার কাছে গিয়েছে সেটা এভাবে জানা যাবেনা। কেননা শুধুমাত্র এড্রেস দিয়ে চলে যাবে টাকা। কোন পরিচয় থাকবেনা।

নিচের ছবিতে দেখা যাবে একটা ট্রানজেকশান দেখতে কেমন। ব্লকচেইনের প্রত্যেকটা ব্লক সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয়। একবার চেইনে একটা ব্লক যোগ হয়ে গেলে সেটাতে কোন প্রকারের পরিবর্তন অসম্ভব। ব্লকগুলো পাশাপাশি তাদের সৃষ্টির ক্রমানুসারে বসে। প্রত্যেকটা ব্লক তার আগে কোন ব্লক আছ সেটা জানে। এভাবে একটা ব্লকের সাথে আরেকটা কানেক্টেড। ব্লকচেইন ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড সিস্টেম, অর্থাৎ সারা পৃথিবীতে বলতে গেলে একই ব্লকচেইনের সব ইউজার বা ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষ ইউজারদের কাছে একেবারে কার্বন কপি আছে। কাজেই একটা বা শ-খানেক সার্ভার বা কম্পিউটার একসাথে নস্ট হয়ে গেলেও ব্লকচেইনের কিছুই হবেনা।

ক্রিপটোকারেন্সিঃ
আমাদের প্রচলিত মুদ্রার মত ক্রিপ্টোকারেন্সি ও এক প্রকার মুদ্রা বা বিনিময় মাধ্যম। অর্থাৎ প্রচলিত মুদ্রা যেমন, ডলার, পাউন্ড, টাকা ইত্যাদি দিয়ে যে কাজ করা যায়, ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়েও সেই একই কাজ করা যায়। ব্লকচেইন টেকনোলজির মাধ্যমে লেনদেনের জন্য এই ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করা হয়। এইরকম মুদ্রা অনেক আছে, যেমন বিটকয়েন, বিটক্যাশ, মোনেরো, লাইটকয়েন ইত্যাদি। আমাদের মুদ্রা যেমন, ডলার, পাউণ্ড, টাকা ইত্যাদির দাম বিভিন্ন সময় ওঠানামা করে, এগুলোর ক্ষেত্রেও তাই, অর্থাৎ ক্রয়/বিক্রয় মূল্য ওঠানামা করে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি
ক্রিপ্টোকারেন্সি
তো এতক্ষণে নিশ্চইয় বুঝতে পেরেছেন ক্রিপ্টোকারেন্সি মানে কি। চলুন এবার তাহলে ক্রিপ্টোকারেন্সির কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

ক্রিপ্টোকারেন্সি ( যেমন ধরুন, বিটকয়েন) একটি নেটওয়ার্কের মতো। প্রতিটি পিয়ারের সমস্ত লেনদেনের সম্পূর্ণ ইতিহাস এবং এইভাবে প্রতিটি অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্সের রেকর্ড আছে। যেমন একটি ট্রান্সজেকশন ফাইল বলছে, "শামছুল x পরিমাণ বিটকয়েন অ্যালিস্কে দেয়" এবং এটি শামছুল হকের ব্যাক্তিগর কী দ্বারা সাক্ষরিত। এটি মৌলিক পাবলিক কী ক্রিপ্টোগ্রাফি। স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে একটি লেনদেন পুরো নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি এক পিয়ার থেকে অন্য পিয়ারে পাঠানো হয়। এটি মৌলিক P2P প্রযুক্তি। নিচের ইনফোগ্রাফ থেকে ধারণা পাওয়া যাবে কিভাবে ব্লকচেইন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি কাজ করে। ছবিটিতে ক্লিক করলে বড় আকারে দেখঅ যাবে।

Blockchain Infographic [www.pwc.com]
Blockchain Infographic [www.pwc.com]
লেনদেনটি অতি দ্রুত সম্পন্ন হয়। তবে নির্দিষ্ট সময় পরে নিশ্চিত হয়। অনেকটা কোন একাউন্ট অ্যাকটিভ করার মাধ্যমে কনফার্ম করার মতো। এই কনফার্ম বা নিশ্চিতকরণ ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যতক্ষণ লেনদেন অনিশ্চিত হয় ততক্ষণ, এটি মুলতুবি আছে এবং জাল করা হতে পারে। যখন একটি লেনদেন নিশ্চিত করা হয়, এটি পুরোপুরিভাবে লেজারে সেট করা হয়। এটিকে আর সংশোধন করা যাবেনা, মুছে ফেলা যাবে না। অর্থাৎ লেজারের তথ্য আর আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন না। এই প্রসেসটিই মূলত ব্লকচেইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা আগেই আলোচনা করা হয়েছে।
শুধুমাত্র মাইনাররা ট্রানজেকশন নিশ্চিত করতে পারবেন। মূলত ক্রিপ্টোকারেন্সি নেটওয়ার্কে এটিই মাইনারদের কাজ। তারা ট্রানজেকশন গ্রহন করে, লেজারে জমা রাখার পর নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে দেয়। যখনি মাইনার কর্তৃক ট্রানজেকশন নিশ্চিত করা হয়, তখনি সেটা অপরিবর্তনীয় ব্লকচেইনের অংশ হয়ে যায়। এই কাজের জন্য মাইনাররা ক্রিপ্টোকারেন্সির টোকেন (ফী বলা যায়) লাভ করে (যেমন: বিটকয়েন)। যেহেতু মাইনরদের কার্যকলাপ ক্রিপ্টোকুরেন্স-সিস্টেমের একক সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাই আমরা মাইনরদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবো।

প্রচলিত সকল মুদ্রার নিয়ন্ত্রক হল কোন দেশের সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারি হোক বা আমেরিকার মত প্রাইভেট হোক, দেশের অর্থনীতি এবং আরও অন্যান্য কিছু বিষয় বিবেচনা করে নতুন কারেন্সি তৈরি করতে পারে। সোজা বাংলায় নতুন 'ব্যাংক নোট' ছাপতে দিতে পারে। অর্থাৎ সেটা নিয়ন্ত্রকেরা নিজেদের ইচ্ছামত করতে পারে, কার লাভ কার ক্ষতি সেটা নিয়ে তাদের মাথা না ঘামালেও তাদের চলে অনেকসময়। যেমন, আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টাকা ছাপা হওয়ার কারনে আমাদের মুদ্রাস্ফীতি আছে।

কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে তৈরি হয়। এখানে নতুন কারেন্সি বা বিটকয়েন আসে প্রতি ১০ মিনিটে একটি ক্রিপ্টোগ্রাফিক পাজল সমাধান করার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। আর এই পাজল প্রতিযোগিতাই হয় মাইনারদের মাধ্যমে।

যারা এনক্রিপশান সম্পর্কে জানে, তাদের কাছে SHA256 এনক্রিপশান পরিচিত হওয়ার কথা। যারা পরিচিত না, এটুকু জানলেই হবে, যে কোন ডেটাকে SHA256 এ যদি এনক্রিপ্ট করা হয় তাহলে ওই ডেটার জন্য একটা হ্যাশ পাওয়া যায়। হ্যাশ হল বোঝার সুবিধার্থে, "000001beeca3785d515897041af0a7" এরকম কিছু একটা। এখন এই ডেটা থেকে যদি অতি সামান্য কোন কিছুও পরিবর্তন হয়, তাহলে একটি ভিন্ন হ্যাশ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ এভাবে এনক্রিপ্ট করলে নির্দিষ্ট একটা ডেটার জন্য হ্যাশ সর্বদা একই হবে, এবং সবার কম্পিউটারেই একই হবে।

এখন লক্ষ করি, উপরে যে হ্যাশটা আমি ব্যবহার করেছি ওখানে শুরুতে ৫টা জিরো আছে। এটা ইচ্ছাকৃত। এবং এটাই সেই ক্রিপটোগ্রাফিক পাজল যেটার কথা একটু আগে বলেছি। প্রতি মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে বিটকয়েনের ব্লকচেইনে অসংখ্য লেনদেন চলছে। ব্লকচেইনে নতুন একটা ব্লক যোগ হওয়ার পর থেকে আনুমানিক ১০ মিনিট ধরে পেন্ডিং ট্রানজেকশনের ডেটা বিটকয়েন সিস্টেমের সকল মাইনারদের কম্পিউটারে জমতে থাকে। তো কথা হচ্ছে মাইনার মানে আমরা নিজেরা এবং আমরা কম্পিউটার নিয়ে বসে আছি পাজল সমাধান করার জন্য।

এখন আমাদের বা মাইনারদের টার্গেট হল, যে ডেটা আমাদের কাছে এই মুহূর্তে আছে সেটা, আগের ব্লকের হ্যাশ এবং তার সাথে আরেকটা Random Number (এখানে একে Nonce = Number Used Once বলা হয়) মিলিয়ে উপরের মত শুরুতে ৫টা জিরো আছে এরকম প্যাটার্নের একটা হ্যাশ খুঁজে বের করা। এই ৫টা জিরো কেন? এটাকে বলা হয়, ডিফিকাল্টি লেভেল, অর্থাৎ শুরুতে কয়টা জিরো বসবে সেটা আসলে পাজলটা সমাধান করা কত কঠিন সেটা নির্দেশ করে।

এভাবে মুহূর্তের মধ্যে সারা পৃথিবীতে হাজার হাজার মাইনার তাদের কম্পিউটারে সেই কাঙ্ক্ষিত হ্যাশ খুঁজে বের করার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। এই প্রসেস আসলে কোন বিশেষ অ্যালগরিদম বা বুদ্ধি দিয়ে জেতা যাবেনা। একেবারে বাংলা পদ্ধতিতে একটার পর একটা Nonce বা এক্সপ্রেশন প্রয়োগ করে চেক করতে হবে সেই প্যাটার্নের হ্যাশ পাওয়া গেল কিনা।

এই প্রতিযোগিতায় যে মাইনার সবার আগে এই হ্যাশ খুঁজে বের করতে পারে যে জয়ী। হ্যাশ খুঁজে পাওয়া মানে হল, নতুন একটা ব্লকচেইনের জন্য নতুন একটা ব্লক তৈরি হওয়া। চমৎকার না? বাকি মাইনার যারা জিততে পারলোনা তাদের কাজ হল, বিজয়ী মাইনারের রেজাল্ট সঠিক কিনা সেটা ভেরিফাই করা। এভাবে সম্ভবত ৫১.৭% মাইনার ভেরিফাই করে দিলে তখন, নতুন ব্লকটা একটা পরীক্ষিত বা সঠিক ব্লক হিসাবে ব্লকচেইনে যোগ হয়ে যায়।

বিটকয়েন কিভাবে কাজ করে তার একটা ভিজুয়াল আইডিয়া নিচের ভিডিও থেকে পাওয়া যেতে পারে।


বাংলায় ব্লকচেইন নিয়ে যত লিখা আছে তার মাঝে মিডিয়ামের ব্লকচেইন এ ভবিষ্যৎ! লিখাটি সবচেয়ে বেশি সহজ এবং ভালো বলে মনে হয়েছে আমার। সকল তথ্য খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অবশ্যপাঠ্য!

ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে অনেক আলোচনা করা হলো।ক্রিপ্টোকারেন্সির অনেক ধরণের প্রকারভেদ আছে।যদি বিটকয়েন অধিক ব্যবহৃত ক্রিপ্টোকারেন্সি।এছাড়াও অনেক ধরণের ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে।

অন্যদিকে ক্রিপ্টোকারেন্সির সিকিউরিটি নিয়েও অনেকের সন্দেহ থাকতে পারে। বাকী সব ক্রিপ্টোকারেন্সি, ক্রিপ্টোকারেন্সির নিরাপত্তা এবং ভবিষৎ নিয়ে আগামী পর্বে আলোচনা করা হবে। সবাইকে সেই পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে আজকে এখানেই শেষ করছি।অনলাইনে লেনদেনে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা বিটকয়েন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার হয়ে আসছে বেশ কয়েক বছর থেকে এবং দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই ‘ক্রিপটোকারেন্সি’। বাংলাদেশেও সম্প্রতি এর লেনদেন শুরু হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বিটকয়েনের আইনি কোনো ভিত্তি নেই। আর ঝুঁকি এড়াতে এ দিয়ে লেনদেন কিংবা এর প্রসারে সহায়তা কিংবা প্রচার থেকে বিরত থাকতে সবাইকে অনুরোধ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার প্রচলন করে। এ ধরনের মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি নামে পরিচিতি পায়। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সে ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেওয়া হয় বিটকয়েন।এছাড়াও আছে ইথিরিয়াম, রিপেল, লাইটকয়েন। তবে সবার থেকে জনপ্রিয় বিটকয়েন।
কিন্তু বিটকয়েন কী? আর কীভাবেই বা কাজ করে বিটকয়েন? আসুন তা জেনে নেয়া যাক-

বিটকয়েন কী?
উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, বিটকয়েন হল এক ধরনের ‘মুদ্রা’ যা দিয়ে অনলাইনে লেনদেন করা যায়। এটিকে ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ক্রিপটোগ্রাফিক কারেন্সি বলা হয়। মূলত এটি হল ওপেন সোর্স ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রোটকলের মাধ্যমে লেনদেন হওয়া সাংকেতিক মুদ্রা। বিটকয়েনের সবথেকে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এটি লেনদেনের জন্য কোন ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না। আর তাই প্রয়োজন হয় না কোন অনুমোদনেরও। আর ইন্টারনেটে লেনদেনকারীদের নিকট খুবই জনপ্রিয় বিটকয়েন।

ইতিহাস
অস্ট্রেলিয়ার এক কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ী সাতোশি নাকামোতো ২০০৮ সালে এই মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন করেন। তিনি এ মুদ্রা ব্যবস্থাকে পিয়ার-টু-পিয়ার লেনদেন নামে অভিহিত করেন।বিটকয়েনের লেনদেনটি বিটকয়েন মাইনার নামে একটি সার্ভার কর্তৃক সুরক্ষিত থাকে। পিয়ার-টু-পিয়ার যোগাযোগ ব্যাবস্থায় যুক্ত থাকা একাধিক কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মধ্যে বিটকয়েন লেনদেন হলে এর কেন্দ্রীয় সার্ভার ব্যবহারকারীর লেজার হালনাগাদ করে দেয়। একটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে নতুন বিটকয়েন উৎপন্ন হয়। ২১৪০ সাল পর্যন্ত নতুন সৃষ্ট বিটকয়েনগুলো প্রত্যেক চার বছর পরপর অর্ধেকে নেমে আসবে। ২১৪০ সালের পর ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন তৈরী হয়ে গেলে আর কোন নতুন বিটকয়েন তৈরী করা হবে।

কার্যপ্রণালী
বিটকয়েনের লেনদেন হয় পিয়ার টু পিয়ার বা গ্রাহক থেকে গ্রাহকের কম্পিউটারে। আগেই বলা হয়েছে এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান নেই। বিটকয়েনের সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অনলাইনে একটি উন্মুক্ত সোর্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে। বিটকয়েন মাইনারের মাধ্যমে যেকেউ বিটকয়েন উৎপন্ন করতে পারে। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াটা সবসময় অনুমানযোগ্য এবং সীমিত। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার সাথে সাথে এটি গ্রাহকের ডিজিটাল ওয়ালেটে সংরক্ষিত থাকে। এই সংরক্ষিত বিটকয়েন যদি গ্রাহক কর্তৃক অন্য কারও একাউন্টে পাঠানো হয় তাহলে এই লেনদেনের জন্য একটি স্বতন্ত্র ইলেক্ট্রনিক সিগনেচার তৈরী হয়ে যায় যা অন্যান্য মাইনার কর্তৃক নিরীক্ষিত হয় এবং নেটওয়ার্কের মধ্যে গোপন অথচ সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত হয়। একই সাথে গ্রাহকদের বর্তমান লেজার কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে হালনাগাদ হয়। বিটকয়েন দিয়ে কোন পণ্য কেনা হলে তা বিক্রেতার একাউন্টে পাঠানো হয় এবং বিক্রেতা পরবর্তীতে সেই বিটকয়েন দিয়ে পুনরায় পণ্য কিনতে পারে, অপরদিকে সমান পরিমাণ বিটকয়েন ক্রেতার লেজার থেকে কমিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যেক চার বছর পর পর বিটকয়েনের মোট সংখ্যা পুনঃনির্ধারন করা হয় যাতে করে বাস্তব মুদ্রার সাথে সামঞ্জস্য রাখা যায়।

সুবিধা-অসুবিধা
অনলাইনে যারা লেনদেন করেন তাদের জন্য খুবই সুবিধাজনক বিটকয়েন। যাদের বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন করার মত সুযোগ নেই বা ক্রেডিট কার্ড নেই তাদের জন্যও ব্যাপক উপকারি এ বিটকয়েন। তবে কোন ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান না থাকা এবং এর কার্যক্রম তদারকি করার কোন সুযোগ না থাকায় অপরাধীদের কাছেও খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিটকয়েন। বৈধ লেনদেনের পাশাপাশি অবৈধ লেনদেনেও ব্যবহৃত হয় বিটকয়েন। জুয়া খেলা বা বাজি ধরা, অবৈধ পণ্য কেনা-বেচা ইত্যাদির লেনদেনে ব্যবহৃত হয় বিটকয়েন।মাদক চোরাচালান এবং অর্থপাচার কাজেও বিটকয়েনের ব্যবহার আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আলোচনা-সমালোচনা
সম্প্রতি কানাডার ভ্যানক্যুভারে বিটকয়েন এর প্রথম এটিএম মেশিন চালু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এটি বিটকয়েনকে আরও আগিয়ে নিয়ে যাবে। মাদক, চোরাচালান অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা ও অন্যান্য বেআইনি ব্যবহার ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডীয় সরকার বিটকয়েনের গ্রাহকদের নিবন্ধনের আওতায় আনার চিন্তাভাবনা করছে। অন্যদিকে অনেক দেশই অবস্থান নিচ্ছে বিটকয়েনের বিরুদ্ধে। দিও বিটকয়েন ডিজিটাল কারেন্সি হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিপরীতে এর দর মারাত্মক ওঠানামা, দুষ্প্রাপ্যতা এবং ব্যবসায় এর সীমিত ব্যবহারের কারণে অনেকেই এর সমালোচনা করেন।এখন যুগ ভার্চুয়াল মুদ্রা বা বিটকয়েনের। কিন্তু কি এই ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল মুদ্রা? ডিজিটাল মুদ্রার আদান-প্রদান হয় অনলাইনে। বিনিময়ের সব তথ্য গোপন থাকে, বেশির ভাগ সময়েই থাকে অজ্ঞাত। ধরুন, আপনার অর্থ আছে, কিন্তু পকেটে নেই। ব্যাংকে বা সিন্দুকেও সেই অর্থ রাখা হয়নি। রাখা হয়েছে ইন্টারনেটে। কোনো দিন ছুঁয়েও দেখতে পারবেন না অনলাইনে রাখা ওই অর্থ। শুধু ভার্চ্যুয়াল জগতের এ মুদ্রাকেই বলা হয় ডিজিটাল মুদ্রা বা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা।

ডিজিটাল মুদ্রার আদান-প্রদান হয় অনলাইনে। বিনিময়ের সব তথ্য গোপন থাকে, বেশির ভাগ সময়েই থাকে অজ্ঞাত। এ ধরনের ডিজিটাল মুদ্রাকে বলা হয় ক্রিপ্টোকারেন্সি। এ ধরনের মুদ্রার বিনিময়ে ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি নামের একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে প্রচলিত ভাষা বা সংকেতে লেখা তথ্য এমন একটি কোডে লেখা হয়, যা ভেঙে তথ্যের নাগাল পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতিতে ব্যবহারকারী ছাড়া অন্য কারও কোনো কেনাকাটা বা তহবিল স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া বেশ কঠিন।

এরপরও ডিজিটাল মুদ্রার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা ঘটে গেছে গত শুক্রবার। টোকিওভিত্তিক ডিজিটাল মুদ্রার বিনিময় প্রতিষ্ঠান কয়েনচেকের কম্পিউটার ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক হ্যাক করে মোট ৫৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার মূল্যমানের ডিজিটাল মুদ্রা খোয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২ লাখ ৬০ হাজার গ্রাহক। তবে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের খোয়া যাওয়া অর্থের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার আশ্বাস জানিয়েছে কয়েনচেক। হ্যাকিংয়ে অর্থ চুরির ঘটনায় নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা নিয়ে তোপের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোপনে ও নিরাপদে যোগাযোগের জন্য ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছিল। গাণিতিক তত্ত্ব ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিপ্টোগ্রাফিরও উন্নতি হয়েছে। এতে অনলাইনে ডিজিটাল মুদ্রা সংরক্ষণ ও আদান-প্রদানের বিষয়টি আরও নিরাপদ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

অবশ্য এত নিরাপত্তা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে ডিজিটাল মুদ্রার বিভিন্ন বিনিময় প্রতিষ্ঠানে বেশ কটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল মুদ্রা হিসেবে বিটকয়েনের আবির্ভাব ঘটে। বর্তমানে ইন্টারনেটে এক হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে। কয়েনচেক থেকে চুরি হয়েছে স্বল্প পরিচিত মুদ্রা এনইএম। গত বছরের ডিসেম্বরে নাইসহ্যাশ নামের স্লোভেনিয়ার একটি কোম্পানির মাত কোটি ডলারের বিটকয়েন চুরি হয়। বিটকয়েন চুরির ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালেও। এরও আগে ২০১৪ সালে মুদ্রা চুরির শিকার হয়েছিল আরেক বিনিময় প্রতিষ্ঠান এমটিগক্স। তাদের নেটওয়ার্ক থেকে ৪০ কোটি ডলার চুরি গিয়েছিল। চুরির ঘটনা স্বীকার করার পর ওই প্রতিষ্ঠান শেষে বন্ধই হয়ে যায়।

ডিজিটাল মুদ্রা কোনগুলো?
বিশ্বে এখন হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু আছে। তবে বিনিময় মূল্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে নিচের ডিজিটাল মুদ্রাগুলো:

বিটকয়েন: এখন পর্যন্ত চালু থাকা ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিটকয়েন। এর বিনিময় মূল্যও সবচেয়ে বেশি। সাতোশি নাকামোতো ২০০৯ সালে বিটকয়েন তৈরি করেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বিটকয়েনের বাজার পুঁজির পরিমাণ ছিলে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার। কিছুদিন আগে একটি বিটকয়েনের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২০ হাজার ডলার। তবে চলতি বছরে বিনিময় মূল্যের এই হার প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায়।

এথেরিয়াম: ২০১৫ সালে তৈরি হয় এথেরিয়াম। বিটকয়েনের মতো এই মুদ্রারও নিজস্ব হিসাবব্যবস্থা আছে। বিনিময় মূল্যের দিক থেকে এটি দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে বিটকয়েনের পরই আছে এথেরিয়াম। গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার বাজারে পুঁজির পরিমাণ প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০১৬ সালে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর এটি দুটি মুদ্রায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এর বিনিময় মূল্য ৮৪০ ডলারে পৌঁছেছিল। তবে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর প্রতিটি এথেরিয়াম মুদ্রা ১০ সেন্টে বিক্রির ঘটনাও ঘটেছিল।

রিপল: ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রিপল। শুধু ক্রিপ্টোকারেন্সি নয়, অন্যান্য ধরনের লেনদেনও করা যায় এই ব্যবস্থায়। প্রচলিত ধারার বিভিন্ন ব্যাংকও এই ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করছে। বাজারে ১০ বিলিয়ন ডলারের পুঁজি আছে রিপলের।

লাইটকয়েন: বিটকয়েনের সঙ্গে বেজায় মিল আছে লাইটকয়েনের। তবে বিটকয়েনের চেয়ে দ্রুত লেনদেন করা যায় লাইটকয়েনে। এর বাজার মূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার।

‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা-পদ্ধতিতে প্রতিটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্লকচেইন’ নামের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। ছবি: রয়টার্স
‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা-পদ্ধতিতে প্রতিটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্লকচেইন’ নামের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। ছবি: রয়টার্স

কীভাবে কাজ করে ডিজিটাল মুদ্রা?
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিপ্টোকারেন্সি একধরনের বিকেন্দ্রীকৃত প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইনে নিরাপদে অর্থ পরিশোধ করা যায়। আমানতকারীর নাম গোপন রেখে এবং ব্যাংকে না গিয়েই অর্থ জমা রাখা যায়।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থার মতো সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল মুদ্রা ছাপায় না। ‘মাইনিং’ নামের একটি জটিল গণনা পদ্ধতিতে একেকটি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত এক বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘ব্লকচেইন’। এই ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ লেনদেনসহ বন্ড, স্টক ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদের কেনাকাটাও করা যায়।

ব্যবহারকারীরা অনলাইনে ব্রোকারদের কাছ থেকেও বিভিন্ন ডিজিটাল মুদ্রা কিনতে পারেন। অনলাইনে ‘ক্রিপ্টোগ্রাফিক ওয়ালেট’ নামক নিরাপদ স্থানে রাখা যায় এই মুদ্রা।

নির্দিষ্ট ডিজিটাল মুদ্রা যত বেশি মানুষ কেনে, সেই মুদ্রার বাজার দর তত বাড়ে। এভাবেই শেয়ার বাজারের মতো নিয়মিত ওঠানামা করে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময় মূল্য। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবহারকারী পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন থাকে বলে অনেক সময় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার বেশি দেখা যায়।

বিশ্বে এখন হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু রয়েছে। তবে বিনিময় মূল্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বিটকয়েন।

কেন ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোকারেন্সি?
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচয় গোপন ও লেনদেন ব্যবস্থায় কঠোর নিরাপত্তা—এই দুটি বিষয়ই হলো ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রাব্যবস্থায় আকৃষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ। এই ব্যবস্থায় একবার লেনদেন হওয়ার পর তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। একই সঙ্গে লেনদেনের খরচ কম হওয়ায় এটি গ্রাহকদের কাছে বেশি নির্ভরযোগ্যতা অর্জন করেছে। এর প্রযুক্তিব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকৃত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, সবার হাতের কাছেই থাকে ডিজিটাল মুদ্রা। যেখানে প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থায় ব্যাংক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্ট না খুললে সেবা পান না কোনো গ্রাহক।

ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে আকৃষ্ট হওয়ার আরেকটি কারণ হলো এতে কম বিনিয়োগ করেই ব্যাপক লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ, প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থার তুলনায় ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর বিনিময় মূল্যের ওঠা-নামা বেশি। তাই রাতারাতি ধনী হওয়ার সুযোগও থাকে। ঠিক এই কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিটকয়েন বা অন্যান্য শীর্ষ ডিজিটাল মুদ্রায় বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে।

তবে এর কিন্তু উল্টো দিকও আছে। অর্থাৎ দর বেড়ে গেলে যেমন ধনী হওয়ার সুযোগ আছে, তেমনি হুট করে দর নেমে গেলে রাস্তাতেও নামতে পারেন। আবার কঠোর গোপনীয়তা থাকায় অবৈধ কর্মকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট লেনদেনে পছন্দের শীর্ষে আছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। তাই বিনিয়োগকারীদের এসব বিষয়ে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে।বর্তমানে ফেসবুক কিংবা ইউটিউবের কল্যাণে আমাদের সবাই হয়তো কখনো না কখনো বিটকয়েন শব্দটি শুনেছি। কিন্তু বিটকয়েন সম্পর্কে বিস্তারিত আমরা অনেকেই ভালোভাবে জানি না। বিটকয়েন কী? কীভাবে কাজ করে? কী কী কাজে ব্যবহার করা হয়? চলুন জেনে নেয়া যাক এসব প্রশ্নের উত্তর।

বিটকয়েন কী?
বিটকয়েন হলো একধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি। আর ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো এমন একধরনের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থা যার কোনো ফিজিক্যাল বা বাস্তব রূপ নেই। বিটকয়েন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি।



বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো বিটকয়েন; Source: crypto-news.net

সাধারণত আমরা টাকা-পয়সা লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি তৃতীয় পক্ষীয় সংস্থার আশ্রয় নেই। যেমন মনে করুন, আপনি আপনার বন্ধুকে কিছু টাকা পাঠাবেন। এক্ষেত্রে আপনি আপনার ফোনের বিকাশ/রকেট একাউন্ট থেকে আপনার বন্ধুকে টাকাটি পাঠিয়ে দিলেন। এখানে আপনি প্রেরক, আপনার বন্ধু প্রাপক এবং বিকাশ/রকেট তৃতীয় পক্ষ, যে কিনা সমস্ত লেনদেন প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করলো এবং এর জন্য কিছু চার্জ আদায় করলো।

কিন্তু বিটকয়েন এমন একটি মুদ্রা ব্যবস্থা যাতে অর্থ আদান-প্রদানের জন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হয় না। প্রেরকের কাছ থেকে সরাসরি বিটকয়েন প্রাপকের কাছে পৌছে যায়। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘পিয়ার টু পিয়ার’ (peer-to-peer)। এক্ষেত্রে সমস্ত লেনদেন প্রক্রিয়াটি হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করে যা অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি প্রক্রিয়া। যেহেতু কোনো তৃতীয় পক্ষীয় সংস্থা এই লেনদেন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে না, সেহেতু বিটকয়েনের লেনদেনের গতিবিধি নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। অর্থাৎ কে কাকে বিটকয়েন পাঠাচ্ছে তার পরিচয় কেউ জানতে পারে না। পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখেই বিটকয়েন লেনদেন করা যায়।

যেভাবে এলো এই বিটকয়েন
২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট। এই দিনে ইন্টারনেট জগতে ‘bitcoin.com’ নামের একটি ওয়েবসাইটের ডোমেইন রেজিস্টার করা হয়। এ বছরেরই নভেম্বর মাসে ‘সাতোশি নাকামোতো’ ছদ্মনামে এক ব্যক্তি বা একটি দল ‘Bitcoin: A Peer-to-Peer Electronic Cash System’ নামে একটি গবেষণাপত্র অনলাইনে প্রকাশ করেন। এই গবেষণাপত্রটিতেই সর্বপ্রথম বিটকয়েন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে সাতোশি নাকামোতো বিটকয়েন তৈরি করার সফটওয়্যারের কোড অনলাইনে রিলিজ করেন। তৈরি হয় বিটকয়েন ‘মাইনিং’ এর সফটওয়্যার। বিটকয়েন মাইনিং হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বিটকয়েন তৈরি করা হয়। ২০০৯ সালের এই জানুয়ারি মাসেই সাতোশি বিশ্বের প্রথম বিটকয়েন তৈরি করেন।


কে এই সাতোশি নাকামোতো তা কেউ জানে না; Source: coindesk.com

বহু বার বহুজনকে সাতোশি নাকামোতো সন্দেহে গ্রেফতার করা হলেও প্রকৃত সাতোশি নাকামোতো কে, বা এই নামের পেছনে কে বা কারা আছে তা আজও জানা যায়নি।

যেভাবে কাজ করে বিটকয়েন
সাধারণ মুদ্রার মতো বিটকয়েন আপনি হাতে নিয়ে লেনদেন করতে পারবেন না। কোনো ব্যাংক কিংবা প্রতিষ্ঠান এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার কারণে বিটকয়েন প্রেরক থেকে সরাসরি প্রাপকের ‘ওয়ালেটে’ চলে যায়। ওয়ালেট হচ্ছে আপনার মানিব্যাগের মতো, যেখানে আপনার নিজের বিটকয়েন জমা থাকে। ওয়ালেট অনলাইন কিংবা অফলাইন দু’ধরনেরই হয়। অনলাইন ওয়ালেট ব্যবহারকারী তার স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটারের মাধ্যমে ব্যবহার করতে পারে।


স্মার্টফোনের মাধ্যমেই ব্যবহার করা যায় ডিজিটাল ওয়ালেট; Source: letstalkpayments.com

প্রতিটি ওয়ালেটের একটি নির্দিষ্ট এড্রেস বা ঠিকানা থাকে। ঠিকানাটি সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড হয় বলে এটি মনে রাখা অসম্ভব। বিটকয়েন লেনদেনের জন্য ব্যবহারকারী তার এই ঠিকানাটি ব্যবহার করে থাকেন।


ব্লকচেইনে জমা থাকে সব লেনদেনের হিসাব; Source: idmmag.com

এক এড্রেস থেকে অন্য এড্রেসে বিটকয়েন পাঠালে তা সাথে সাথে একটি উন্মুক্ত খতিয়ানে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়, যার নাম ‘ব্লকচেইন’। এটি এমনই বিশাল একটি খতিয়ান ব্যবস্থা যাতে এযাবতকালে যত বিটকয়েন লেনদেন হয়েছে তার সবগুলোরই রেকর্ড রয়েছে। প্রতিটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে নেটওয়ার্কে একটি নতুন বিট কয়েন তৈরি হয়। পদ্ধতিকেই বলা হয় বিটকয়েন মাইনিং।

যেভাবে করা হয় বিটকয়েন মাইনিং
বিটকয়েন মাইনিং একটি জটিল প্রক্রিয়া। একটি নির্দিষ্ট মাইনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হয়। এজন্য প্রয়োজন হয় উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কম্পিউটার। কম্পিউটারের সিপিইউ এবং জিপিইউ ব্যবহার করে জটিল কিছু গাণিতিক এলগরিদমের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।


একটি বিটকয়েন মাইনিং রিগ; Source: youtube.com

প্রতিটি বিটকয়েন লেনদেন করা হলে তা ব্লকচেইনে লিপিবদ্ধ হয়। এ সময় বিটকয়েন মাইনাররা মাইনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের বৈধতা নির্ণয় করেন। আর এ সময়ই একটি নতুন বিটকয়েন তৈরি হয়।

বিটকয়েন লেনদেন ও নতুন বিটকয়েন তৈরির এই সমস্ত প্রক্রিয়াটিই ঘটে অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে। ফলে এতে কোনো ধরনের ছলচাতুরী কিংবা প্রতারণার সম্ভবনা থাকে না। উভয় পক্ষেরই পরিচয় থাকে গোপন।

বিটকয়েনের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য
বিটকয়েন একটি সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীভূত মুদ্রা ব্যবস্থা। সরকার কিংবা কোনো কর্তৃপক্ষ এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার ফলে এখানে প্রত্যেক ব্যবহারকারী তাদের বিটকয়েনের প্রকৃত মালিক। অন্য কেউ তাদের বিটকয়েন নেটওয়ার্কের মালিকানা নিতে পারে না।
বিটকয়েন লেনদেনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিই হয় নাম বিহীনভাবে। একজন বিটকয়েন ব্যবহারকারী একাধিক বিটকয়েন একাউন্ট খুলতে পারে। এসব একাউন্ট খোলার জন্য কোনো ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন ব্যবহারকারীর নাম, ঠিকানা ইত্যাদি প্রয়োজন হয় না। ফলে ব্যবহারকারীর প্রকৃত পরিচয় থাকে গোপন।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে। প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড ব্লকচেইনে জমা থাকে যা যে কেউ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে যখন তখন দেখতে সক্ষম। ফলে এখানে কোনো দুর্নীতির সুযোগ নেই।
বিটকয়েন একাউন্ট খোলা খুবই সহজ। এক্ষেত্রে সাধারণ ব্যাংক একাউন্ট খোলার মতো কোনো ঝামেলাযুক্ত ফর্ম পূরণ করতে হয় না। কোন এক্সট্রা ফি-ও প্রয়োজন হয় না। কোনো কাগজপত্রও জমা দেওয়া লাগে না।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া খুবই দ্রুত। পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই বিটকয়েন পাঠানো হোক না কেন তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাপকের কাছে পৌঁছে যাবে।
বিটকয়েনের কিছু অসুবিধা
বিটকয়েন সম্পূর্ণ অফেরতযোগ্য। অর্থাৎ কেউ ভুল করে কোনো ভুল ঠিকানায় বিটকয়েন পাঠিয়ে দিলে তা আর ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়।
বিটকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে না। প্রেরক-প্রাপক উভয়ের পরিচয়ই সম্পূর্ণ গোপন থাকে। ফলে অনেক অপরাধমূলক কাজে বিটকয়েন ব্যবহার করা সম্ভব। অবৈধ পণ্যের কেনা বেচাতেও বিটকয়েন ব্যবহৃত হয়। ইন্টারনেটের গোপন অংশ ডার্ক ওয়েবের সমস্ত লেনদেন হয় বিটকয়েনের মাধ্যমে।
বিটকয়েনের মূল্য অনেকটাই অস্থিতিশীল। কখনো বিশাল পরিমাণে বাড়ে তো কখনো বিশাল ধস নামে।
বর্তমান বিশ্বে বিটকয়েনের মূল্য ও বাংলাদেশে এর অবস্থা
বিটকয়েন প্রথম চালু হওয়ার পর থেকে দিন দিন এর মূল্য বেড়েই চলেছে। ২০১১ সালে বিটকয়েনের বাজারমূল্য সর্বপ্রথম ০.৩০ ডলার থেকে ৩২ ডলারে উঠে। এরপর ২০১৩ সালে এর দাম উঠে যায় ২৬৬ ডলারে। এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বিটকয়েনের দাম। ২০১৬ সালের শেষের দিকে এই দাম চলে আসে ৬০০ ডলারের উপরে। এরপর ২০১৭ সালে বিটকয়েনের দাম বেড়ে যায় রেকর্ড পরিমাণ। প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার করে বাড়তে বাড়তে এ বছরের নভেম্বরে বিটকয়েনের দাম উঠে যায় ৯,০০০ ডলারের কাছাকাছি। আর এই ডিসেম্বর মাসেই এই দাম বেড়ে পরিণত হয় ১৫,০০০ ডলারেরও বেশিতে যা সত্যিই অভূতপূর্ব একটি ঘটনা।


বিটকয়েনের দাম বেড়েছে ব্যাপক হারে; Source: coindesk.com

বিশ্বের বহু দেশে বিটকয়েন অনেক জনপ্রিয়। ওয়ার্ডপ্রেস, মাইক্রোসফট, উইকিপিডিয়া, ওভারস্টকের মতো বিশ্বের প্রায় ত্রিশ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান বিটকয়েন গ্রহণ করে। দিন দিন এর জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বাড়ছে। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস পর্যন্ত বিটকয়েন নিয়ে মন্তব্য করছেন, “Bitcoin is better than currency“।

এখন চলুন দেখি বাংলাদেশে বিটকয়েনের অবস্থান নিয়ে। বাংলাদেশ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসাবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনে অন্তর্ভুক্ত হয় ২০১৪ সালের ১৫ আগস্টে। কিন্তু বিটকয়েন ফাউন্ডেশনে যুক্ত হওয়ার ঠিক এক মাসের মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় বিটকয়েনের সকল লেনদেনের উপর। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দেশে বিটকয়েনের সকল প্রকার লেনদেন থেকে জনগণকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানায়। অর্থাৎ বিটকয়েন লেনদেনকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশে বিটকয়েনের উপর এই নিষেধাজ্ঞা বজায় রয়েছে।ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ (bitcoin) এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। গত ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনের সদস্যপদ পেয়েছে।

ঢাকা: ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ (bitcoin) এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। গত ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বিটকয়েন ফাউন্ডেশনের সদস্যপদ পেয়েছে। কিন্তু বিটকয়েন কি, কিসের জন্য? কি কাজে প্রয়োজন? এরকম নানাবিধ প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে বাংলানিউজ তার পাঠকদের জন্য নিয়ে এসেছে বিটকয়েন-এর উপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন। প্রথম পর্বে থাকছে ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘বিটকয়েন’ পরিচিতি।

সাধারণত কাগজের তৈরি প্রচলিত মুদ্রা বা এ সংশ্লিষ্ট কোন ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্বলিত বস্তু ব্যবহার করে বাস্তব জীবনে এবং অনলাইনে লেনদেন সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো আপাতঃ দৃষ্টিতে কোন প্রকারের সমস্যা ছাড়াই মিটিয়ে ফেলা যায়। তবে বর্তমানে ব্যবহৃত এটিএম কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড অথবা অন্য ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্বলিত বস্তুগুলো ব্যবহারে দুটি বড় সমস্যা রয়েছে।

এসবে লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহক ও গ্রহিতা উভয়কে তৃতীয় কোন পক্ষের উপর ‘ট্রাস্ট’ বা আস্থা রাখতে হয়, উদাহরণস্বরূপ ব্যাংক। তৃতীয় পক্ষ এই ব্যাংকে উভয় পক্ষ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের মুদ্রা পরিশোধ করে, যেটিকে ইংরেজীতে বলে ‘ডাবল স্পেন্ডিং’।ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা ইথিরিয়াম জনপ্রিয় হচ্ছে। বিটকয়েনের পরেই রয়েছে এ মুদ্রা। বিটকয়েনের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই? প্রযুক্তি দুনিয়ায় হইচই তোলা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা বিটকয়েন। অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার প্রচলন করে। এ ধরনের মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি নামে পরিচিতি পায়। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সে ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেওয়া হয় বিটকয়েন।

ক্রিপ্টোকারেন্সির দুনিয়ায় বাজার দখলের দিক থেকে বিটকয়েনের পরের অবস্থানে আছে ইথিরিয়াম। ২০১৩ সালে ভিটালিক বুটকারিন প্রতিষ্ঠিত এ ভার্চ্যুয়াল মুদ্রায় ইথার নামের একটি ক্রিপটোকারেন্সি ব্যবহৃত হয়। অর্থ পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে ও মুদ্রা ব্যবহৃত হয়।

ইথিরিয়াম কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। এ মুদ্রা দিয়ে বিনিয়োগ, বিভিন্ন চুক্তিসহ নানা কাজ করা হয়। ইথিরিয়াম সাধারণত ‘স্মার্ট কনট্রাক্টসে’ ব্যবহৃত হয়। এ স্মার্ট কনট্রাক্টস হচ্ছে লেনদেনের প্রোটোকল বা প্রোগ্রাম যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই চুক্তির শর্ত পূরণ করে।

২০১৬ সাল থেকে এ মুদ্রা দিয়ে লেনদেন হয় এবং বর্তমানে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা জগতে ২৭ শতাংশ দখল করে রেখেছে। ডয়চে ব্যাংক ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের এক প্রতিবেদনে অনুযায়ী, প্রতি বছর এক কোটি ৮০ লাখ ইথারের বেশি অনুমোদন করা হয় না। ইথারের অনুমোদন সীমিত হওয়ায় প্রতিবছর এর চাহিদা বাড়ছে এবং আপেক্ষিক মুদ্রাস্ফীতি হার কম থাকে। এটি মূলত ইথহ্যাস মাইনিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে।

দ্য বিটকয়েন বিগ ব্যাং নামের বইয়ের লেখক ব্রায়ান কেলি লিখেছেন, ইথিরিয়ামের লক্ষ্য হচ্ছে কোনো ডেভেলপারের জন্য স্মার্ট কন্ট্রাক্ট লেখা সহজ করা বা ইথিরিয়াম ব্লকচেইনে চলবে। এ প্রযুক্তির প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না।

বিটকয়েন ও ইথিরিয়াম ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি ক্রিপটোকারেন্সি এখন আলোর মুখ দেখেছে। এর মধ্যে আছে রিপল, লাইটকয়েন, মনেরো, ড্যাশ, এনইএম প্রভৃতি
বিটকয়েন ও ইথিরিয়াম ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি ক্রিপটোকারেন্সি এখন আলোর মুখ দেখেছে। এর মধ্যে আছে রিপল, লাইটকয়েন, মনেরো, ড্যাশ, এনইএম প্রভৃতি
বিটকয়েন ও ইথিরিয়াম ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি ক্রিপটোকারেন্সি এখন আলোর মুখ দেখেছে। এর মধ্যে আছে রিপল, লাইটকয়েন, মনেরো, ড্যাশ, এনইএম প্রভৃতি
বিটকয়েন ও ইথিরিয়াম ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি ক্রিপটোকারেন্সি এখন আলোর মুখ দেখেছে। এর মধ্যে আছে রিপল, লাইটকয়েন, মনেরো, ড্যাশ, এনইএম প্রভৃতি
বিটকয়েন ও ইথিরিয়াম ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি ক্রিপটোকারেন্সি এখন আলোর মুখ দেখেছে। এর মধ্যে আছে রিপল, লাইটকয়েন, মনেরো, ড্যাশ, এনইএম প্রভৃতি

[ Post made via Android ]
User avatar

Rafiq123
BabyUnicorn
BabyUnicorn
Posts: 52
Joined: 19 Mar 2018, 17:24
Cash on hand: 40,967.72
Has thanked: 27 times
Been thanked: 4 times
Bangladesh

#32431

26 Mar 2018, 03:42

আপনি অনেক সুন্দরভাবে পোস্টটি উপস্থাপন করসেন। ভালো লাগলো।আসা করবো এমন জ্ঞানমূলক পোস্ট সামনে আরো পাবো।

[ Post made via Android ]

Was This Topic Useful?

Post Reply

Return to “"বাংলাদেশি কমিউনিটি" (Bengali)”

  • Information
  • Who is online

    Users browsing this forum: No registered users and 5 guests